বিশেষ প্রতিবেদন: মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে স্বস্তি ফিরছে না। মাছ, মুরগি ও ডিমের চড়া দামে চাপে পড়েছেন ক্রেতারা। একই সঙ্গে আয় ও ব্যয়ের হিসাব মেলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ।
বাজারে অধিকাংশ মাছের দাম এখন ২০০ টাকার ওপরে। ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১৯০ টাকা, সোনালি মুরগি ৩২০ এবং দেশি মুরগি ৬৫০ টাকা দরে। ডিমের ডজন ১৩০ থেকে ১৫০ টাকা। পাড়া-মহল্লার দোকানে তা ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে।
মাছের বাজারেও স্বস্তি নেই। তেলাপিয়া ২৫০ থেকে ২৬০, পাঙাশ ২৩০ থেকে ২৫০, রুই-কাতলা ৩৮০ থেকে ৪২০, পাবদা ৩৫০ থেকে ৪০০ এবং ট্যাংরা ৭০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। চিংড়ির দাম ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত। ৯০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি ওজনের ইলিশের দাম প্রায় ২ হাজার ৫০০ টাকা।
তবে গত মাসের তুলনায় কিছুটা কমেছে সবজির দাম। অধিকাংশ সবজি ৬০ থেকে ৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি হলেও মৌসুম না হওয়ায় শিম, গাজর, টমেটো, বেগুন ও বরবটির দাম তুলনামূলক বেশি।
শিম ২০০, গাজর ১৪০, টমেটো ১৩০, বেগুন ১২০, বরবটি ১০০ এবং কাঁচা মরিচ ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে পটল, শসা ও ঢ্যাঁড়স ৬০ টাকা এবং করলা, ঝিঙা, চিচিঙ্গা, কাঁকরোল ও মুলা ৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। পেঁপে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৪০ টাকা কেজিতে।
বিক্রেতারা বলছেন, কিছু সবজির সরবরাহ কম থাকায় দাম বেশি। তবে অন্যান্য সবজির সরবরাহ স্বাভাবিক থাকায় সেগুলোর দাম আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে।
বাজারে সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তির জায়গা এখানেই। মূল্যস্ফীতি কমেছে মানেই পণ্যের দাম কমেছে—এমনটা নয়। বরং এর অর্থ হলো দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, জুলাই ২০২৬-এ দেশে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমেছে। জুনে যা ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। একই সময়ে ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
সহজ উদাহরণে বিষয়টি বোঝা যায়। কোনো পণ্যের দাম দুই বছর আগে ১০০ টাকা থেকে পরের বছর ১০৮ টাকা এবং এ বছর ১১৫ টাকা হলে পণ্যের দাম প্রতিবছরই বেড়েছে। শুধু দ্বিতীয় বছরে দাম বাড়ার পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় কম হয়েছে। এটাই মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ—দাম কমে যাওয়া নয়।
ধরা যাক, গত বছর ৫০০ টাকা দিয়ে পাঁচ কেজি চাল কেনা যেত। এবার একই ৫০০ টাকায় চার কেজি চাল পাওয়া যাচ্ছে। আপনার পকেটে থাকা টাকার পরিমাণ একই, কিন্তু সেই টাকার ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।
মূল্যস্ফীতির প্রভাব শুধু বাজারের ব্যাগেই সীমাবদ্ধ নয়। বাসাভাড়া, পরিবহন, চিকিৎসা, শিক্ষা, পোশাক, বিদ্যুৎ-পানি বিলসহ বিভিন্ন খাতে খরচ বাড়লে একই আয় দিয়ে আগের জীবনযাত্রা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
ফলে কেউ হয়তো সপ্তাহে দুই দিন মাছ কেনার বদলে এক দিন কিনছেন, বাইরে খাওয়া কমিয়ে দিয়েছেন কিংবা মাস শেষে যে টাকা সঞ্চয় করতেন তা আর রাখতে পারছেন না।
মূল্যস্ফীতির চাপ সবার ওপর সমান নয়। কম আয়ের মানুষের আয়ের বড় অংশই খাবার, বাসা ও যাতায়াতের মতো প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় হয়। ফলে এসব খরচ বাড়লে তাদের হাতে ব্যয় কমানোর সুযোগও কম থাকে।
অন্যদিকে বেশি আয়ের মানুষের বাজেটে তুলনামূলকভাবে কিছুটা সামঞ্জস্য করার সুযোগ থাকে। তাই একই মূল্যস্ফীতির হার হলেও বাস্তবে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর এর প্রভাব বেশি পড়ে।
জুলাই ২০২৬-এ জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ২২ শতাংশ। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ।
অর্থাৎ গড়ে মজুরি বাড়ার হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে সামান্য কম। ফলে আয় কিছুটা বাড়লেও মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা পুরোপুরি বাড়েনি।
সোজা কথায়, কারও বেতন ৮ শতাংশ বাড়লেও যদি তার নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ ৯ শতাংশ বাড়ে, তাহলে কাগজে বেতন বাড়লেও বাস্তবে তার হাতে বাড়তি স্বস্তি নাও থাকতে পারে।
পণ্যের দাম বাড়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্য, জ্বালানি ও কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, ডলারের বিনিময়মূল্য বেড়ে যাওয়া, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, সরবরাহ সংকট, পরিবহন ব্যয়, মজুতদারি ও বাজার কারসাজি—সবই এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়ে। পরিবহন ব্যয় বাড়লে বাজারে পণ্য আনার খরচও বাড়ে। আবার কাঁচামালের দাম বাড়লে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি খরচের একটি অংশ গিয়ে পড়ে ভোক্তার ওপর।
না, সবসময় নয়।
কোনো পণ্যের দাম ১০০ টাকা থেকে ১২০ টাকা হওয়ার পর ১২৫ টাকা হলে মূল্যস্ফীতির হার কমতে পারে। কিন্তু পণ্যটির দাম ১০০ টাকায় ফিরে যায়নি।
তাই ‘মূল্যস্ফীতি কমেছে’ আর ‘বাজারে দাম কমেছে’—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে সহজ হিসাব অর্থনীতির বইয়ে নয়, বাজারের ব্যাগে। এক বছর আগে যে টাকা দিয়ে পাঁচটি পণ্য কেনা যেত, এখন যদি একই টাকায় চারটি কিনতে হয়, তাহলে বুঝতে হবে টাকার ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।
সোজা কথায়, মূল্যস্ফীতি শুধু জিনিসপত্রের দাম বাড়ার গল্প নয়; এটি একই টাকায় আগের চেয়ে কম কেনাকাটা করতে পারার গল্প।
–রুপন কর অজিত
https://slotbet.online/