নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল: বরিশাল জেনারেল হাসপাতালে বমি ও শারীরিক দুর্বলতার চিকিৎসা নিতে ভর্তি হওয়া চার মাসের এক অন্তঃসত্ত্বা নারীকে গর্ভের মৃত সন্তান অপসারণে ব্যবহৃত ওষুধ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ওষুধ সেবনের পর ওই নারীর পেট শক্ত ও ফুলে ওঠাসহ শারীরিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে অনাগত সন্তান নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন স্বজনরা।
বুধবার (১৯ আগস্ট) রাত ১২টার দিকে বরিশাল জেনারেল হাসপাতালের প্রসূতি বিভাগে এ ঘটনা ঘটে। পরিবারের অভিযোগ, চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী ওষুধ দেওয়া হলেও পরে বিষয়টি নার্সের ভুল বলে দায় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। ঘটনার প্রায় ২৪ ঘণ্টা পরও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ স্বজনদের।
হাসপাতাল সূত্র ও রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভুক্তভোগী নারী গত ১৮ আগস্ট বমি ও শারীরিক দুর্বলতার চিকিৎসার জন্য বরিশাল জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন। গাইনি চিকিৎসক ডা. রেহানা ফেরদৌসের পরামর্শে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
রোগীর স্বামী মামুন হোসেন বলেন, রাতে গাইনি বিভাগের রেজিস্ট্রার ডা. মো. শাহরিয়ার হক সুমন রোগীকে দেখে ব্যবস্থাপত্র দেন। পরে হাসপাতালের ফার্মেসি থেকে ওষুধ এনে স্ত্রীকে খাওয়ানো হয়।
মামুনের ভাষ্য, ওষুধ খাওয়ার কিছুক্ষণ পর তার স্ত্রীর পেট শক্ত ও ফুলে উঠতে শুরু করে। বিষয়টি চিকিৎসককে জানালে তাকে বলা হয়, গর্ভে নষ্ট হয়ে যাওয়া সন্তান বের করার জন্য ব্যবহৃত ওষুধ দেওয়া হয়েছে।
এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন রোগীর স্বজনরা। তারা চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট নার্সদের বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তুলে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
স্বজনদের আরও অভিযোগ, বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর দায়িত্বশীলদের কেউ কেউ চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্র সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করেন। অভিযোগের বিষয়ে ডা. শাহরিয়ার হক সুমনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
বরিশাল জেনারেল হাসপাতালের গাইনি বিভাগের চিকিৎসক ডা. রেহানা ফেরদৌস বলেন, রোগীকে যে ওষুধ দেওয়া হয়েছে, সেটি সাধারণত গর্ভের মৃত সন্তান অপসারণের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়।
তিনি বলেন, “এখন রোগীকে কেন এই ওষুধ দেওয়া হয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে এই ওষুধে পেটের জীবিত বাচ্চার ক্ষতি হয় না। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সব ঠিক হয়ে যায়।”
অন্যদিকে হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. ময়ল কৃষ্ণ বড়াল বলেন, ঘটনার পর বৃহস্পতিবার সকালে রোগীর আল্ট্রাসনোগ্রাম করা হয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, গর্ভের সন্তান ভালো আছে।
তিনি বলেন, রোগীর স্বজনরা বাইরে থেকেও আরেকটি আল্ট্রাসনোগ্রাম করাতে চেয়েছেন। দুটি রিপোর্ট মিলিয়ে বিষয়টি আরও নিশ্চিত হওয়া যাবে।
তবে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ ওঠার পরও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক বা অন্য কারও বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন—এ বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কোনো উত্তর দেননি।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও বরিশাল জেলার ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. মুন্সী মুনিবুল হক বলেন, তিনি বৃহস্পতিবার বিকেলে ঘটনাটি জানতে পেরেছেন।
তিনি বলেন, “যতটুকু জেনেছি, ওই রোগীকে সাইটোমিক ২০০ মিলিগ্রাম ট্যাবলেট খাওয়ানো হয়েছে। এই ট্যাবলেট একটি খাওয়ালে সাধারণত কিছু হয় না।”
তবে রোগী বর্তমানে ভালো থাকলেও ভুল চিকিৎসার অভিযোগের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে বলে জানান তিনি।
ডা. মুন্সী মুনিবুল হক বলেন, আগামী শনিবার তিনি নিজে হাসপাতাল পরিদর্শন করে ঘটনাটি খতিয়ে দেখবেন। প্রয়োজন হলে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে এবং কারও অবহেলা বা দায়িত্বে গাফিলতি প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঘটনাটি নিয়ে রোগীর স্বজনদের প্রশ্ন, একজন চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা নারীকে কীভাবে গর্ভপাত বা গর্ভের মৃত সন্তান অপসারণে ব্যবহৃত ওষুধ দেওয়া হলো। ব্যবস্থাপত্রে ভুল ছিল, নাকি ওষুধ দেওয়ার ক্ষেত্রে ভুল হয়েছে—তা দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, আল্ট্রাসনোগ্রামে গর্ভের সন্তান ভালো থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে ওষুধ দেওয়ার ঘটনায় চিকিৎসাগত বা প্রশাসনিক কোনো অবহেলা হয়েছিল কি না, তা তদন্তের পরই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।
https://slotbet.online/