বরিশালে সিজারিয়ানের পর প্রসূতির মৃত্যু,চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ
- প্রকাশের সময়: 06:26:05 pm, Friday, 25 September 2026
- / 61 Time View
নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল: বরিশাল নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর নাজিয়া রহমান মাইশা (৩০) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) বিকেলে অস্ত্রোপচারের পর তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত মাইশা বরিশাল নগরের কালিজিরা এলাকার বাসিন্দা। তিনি বরিশাল গণপূর্ত বিভাগের সাবেক কর্মচারী প্রয়াত মো. নাজমুর রহমান বাদলের মেয়ে। উদ্যোক্তা হিসেবেও বরিশালে তাঁর পরিচিতি ছিল।
স্বজনদের অভিযোগ, চিকিৎসক ও অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসকের দায়িত্বে অবহেলার কারণে মাইশার মৃত্যু হয়েছে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, অস্ত্রোপচার স্বাভাবিকভাবে সম্পন্ন হয়েছিল। পরে বমির সময় শ্বাসনালিতে খাবার আটকে শ্বাসরোধ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর থেকে বানারীপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের রেজিস্ট্রার ডা. তহুরা আক্তারের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন মাইশা। তাঁর পরামর্শে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের জন্য তাঁকে রাহাত-আনোয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
বৃহস্পতিবার বিকেলে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে মাইশার একটি কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। স্বজনদের দাবি, অস্ত্রোপচারের আগে তিনি স্বাভাবিক ছিলেন এবং হেঁটে অস্ত্রোপচারকক্ষে যান। তবে অস্ত্রোপচারের শেষ দিকে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়।
মাইশার স্বজন সাজ্জাদ হোসেন নয়নের অভিযোগ, অ্যানেসথেসিয়া দেওয়ার পর মাইশা অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং কয়েকবার বমি করেন। তাঁর দাবি, অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসক অস্ত্রোপচারের পুরো সময় রোগীর পাশে ছিলেন না। স্পাইনাল অ্যানেসথেসিয়া দেওয়ার পর তিনি অন্য রোগীর কাছে চলে যান এবং মাইশার অবস্থার অবনতি হলেও যথাযথভাবে খোঁজ নেননি।
নয়নের আরও অভিযোগ, ওই সময় হাসপাতালের আরও দুটি অস্ত্রোপচারকক্ষে কার্যক্রম চলছিল এবং চারটি অস্ত্রোপচারকক্ষের জন্য একজন অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসক দায়িত্বে ছিলেন। মাইশার অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে দ্রুত শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে নেওয়া হয়।
স্বজনদের দাবি, মুমূর্ষু রোগী স্থানান্তরের সময় সাধারণত অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসক সঙ্গে থাকার কথা থাকলেও মাইশার ক্ষেত্রে তা হয়নি। পরে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।
মাইশার আরেক স্বজন শামসুন্নাহার বেগম বলেন, অস্ত্রোপচারের শেষ দিকে হাসপাতালের পক্ষ থেকে তাঁদের দোয়া করতে বলা হয় এবং মাইশার হৃদ্যন্ত্রে সমস্যা হয়েছে বলে জানানো হয়। পরে তাঁরা জানতে পারেন, মাইশাকে পোস্টঅপারেটিভ ইউনিটে নেওয়া হয়েছে।
মাইশার স্বামী হাফিজ আহমেদ বলেন, সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় তাঁর স্ত্রী অস্ত্রোপচারকক্ষে গিয়েছিলেন। সন্তান জন্মের পর তাঁর কী হয়েছিল, সে বিষয়ে পরিবারের কাছে পরিষ্কার কোনো তথ্য ছিল না। চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেন তিনি।
স্বজনদের অভিযোগ অস্বীকার করেছে রাহাত-আনোয়ার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালের ম্যানেজার সাহিল আহমেদ সাকিব বলেন, রোগীর মৃত্যুর জন্য হাসপাতাল বা চিকিৎসকেরা দায়ী নন।
সাহিল আহমেদের ভাষ্য, বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে মাইশাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকেরা স্বাভাবিক প্রসবের চেষ্টা করেন। পরে স্বজনদের অনুরোধে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিকেল ৩টার দিকে তাঁকে অস্ত্রোপচারকক্ষে নেওয়া হয় এবং সাড়ে ৩টার দিকে ডা. তহুরা আক্তার অস্ত্রোপচার শুরু করেন।
হাসপাতাল ব্যবস্থাপকের দাবি, অস্ত্রোপচার স্বাভাবিকভাবে সম্পন্ন হয়েছিল এবং তখন মা ও নবজাতক দুজনই ভালো ছিলেন। পরে মাইশাকে পোস্টঅপারেটিভ ইউনিটে নেওয়া হলে তিনি নবজাতক মেয়েকে দেখেন। সেখানে তাঁর স্বজনেরাও ছিলেন।
কিছুক্ষণ পর হঠাৎ তাঁর রক্তচাপ কমে যায় এবং তিনি তিনবার বমি করেন। দ্রুত সাকার দিয়ে মুখ পরিষ্কার করা হলেও অবস্থার উন্নতি হয়নি। পরে তাঁকে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে পাঠানো হয়।
সাহিল আহমেদ বলেন, আইসিইউ থেকে তাঁদের জানানো হয়, বমির সময় শ্বাসনালিতে খাবার আটকে শ্বাসরোধ হয়ে মাইশার মৃত্যু হয়েছে।
তবে হাসপাতালের এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছেন মাইশার স্বজন নয়ন। তাঁর দাবি, অস্ত্রোপচারের সময় পরিবারের একজন অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ নার্সও সেখানে ছিলেন। নিজেদের দায় এড়াতেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এমন বক্তব্য দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ঘটনার পর ডা. তহুরা আক্তার ও ডা. সোহেল মিয়া আত্মগোপনে রয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন মাইশার স্বজনেরা। তাঁদের ব্যবহৃত মুঠোফোনও বন্ধ রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আল মামুন উল ইসলাম বলেন, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত থানায় কোনো অভিযোগ আসেনি। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
























