
পর্যাপ্ত চিকিৎসক, জনবল, ওষুধ, শয্যা ও অবকাঠামোগত নানা সংকটে বরিশাল বিভাগের স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে চাপে রয়েছে। চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর সংখ্যা বাড়লেও সে অনুযায়ী বাড়েনি হাসপাতালের সক্ষমতা। ফলে শয্যা সংকট, লিফট, টয়লেট ও বিদ্যুৎ সমস্যাসহ নানা ভোগান্তির মুখে পড়ছেন রোগী ও স্বজনরা।
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও বরিশাল বিভাগের স্বাস্থ্যখাতে প্রত্যাশিত উন্নয়ন হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। দীর্ঘদিনের এসব সংকট দ্রুত দূর করে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
তবে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যমান সমস্যাগুলো সম্পর্কে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। সংকট নিরসনে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ চলছে।
শয্যার চেয়ে আড়াই গুণের বেশি রোগী
বরিশাল বিভাগের সবচেয়ে বড় চিকিৎসাকেন্দ্র শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। এক হাজার শয্যায় উন্নীত করা হলেও হাসপাতালটিতে প্রতিদিন এর চেয়ে অনেক বেশি রোগী ভর্তি থাকেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে শয্যা সংকটে অনেক রোগীকে মেঝেতেও চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
এক রোগী বলেন, “সরকারের এখানে আসি যাতে আমাদের কিছু টাকা সাশ্রয় হয়। সেই সাশ্রয়টা যদি আমরা এখানে এসে না পারি, আমার এ পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়ে গেছে শুধু মেডিসিনে।”
আরেক রোগী বলেন, “আমাদের জ্বর হয়েছে, ভাইরাসের জ্বর। কিন্তু বেড পাচ্ছি না। সেই কারণে আমাকে এখানে রাখা হয়েছে।”
হাসপাতালের নতুন ভবনের তিনটি লিফটের মধ্যে দুটি অচল থাকার অভিযোগ রয়েছে। একটি লিফট দিয়ে রোগী, স্বজন ও হাসপাতালের অন্যদের চলাচল করতে হচ্ছে বলে জানান সেবাগ্রহীতারা। এর সঙ্গে টয়লেট ও লোডশেডিংয়ের সমস্যাও রয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।
এক রোগীর ভাষ্য, “টয়লেট, লিফটের ভোগান্তি, লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি থেকে স্যার আমাদের মুক্তি দেন।”
চিকিৎসক সংকটে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
হাসপাতালটি এক হাজার শয্যায় উন্নীত হলেও প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসক সংকট রয়েছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের কর্মকর্তারা।
শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক সার্জন ডা. মো. মাজহারুল রেজোয়ান বলেন, “চিকিৎসক সংকট তো অবশ্যই রয়েছে। ৫০০ জনের হিসেবে চিকিৎসক যেটা ছিল, তারও প্রায় ৫০ শতাংশ পোস্ট খালি।”
অতিরিক্ত রোগীর চাপের পাশাপাশি চিকিৎসক ও জনবল সংকট থাকায় হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা পরিচালনায় চাপ তৈরি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সদর হাসপাতালেও জনবল সংকট
বরিশাল সদর তথা বরিশাল জেনারেল হাসপাতালেও রোগীর চাপের তুলনায় শয্যা ও চিকিৎসকের সংকট রয়েছে। ১০০ শয্যার এই হাসপাতালে অনেক সময় দ্বিগুণ রোগী ভর্তি থাকেন বলে জানা গেছে। বহির্বিভাগেও প্রতিদিন এক হাজারের বেশি রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন।
হাসপাতালে ৬২টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে বর্তমানে ২৬ জন চিকিৎসক কর্মরত রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানানো হয়েছে।
বরিশাল জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মলয় কৃষ্ণ বড়াল বলেন, “যে চিকিৎসক পদ আছে সেখানে এখনও কিছু শূন্য পদ রয়েছে। সেগুলো যদি তাড়াতাড়ি পূর্ণ হয়ে যায়, আশা করি আমাদের সেবার মান আরও বৃদ্ধি পাবে।”
সংকট সমাধানে যোগাযোগ চলছে
হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক ও অন্যান্য জনবলসহ বিভিন্ন সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মো. রেফায়েতুল হায়দার বলেন, বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে যথাযথভাবে জানানো হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমরা এসব বিষয়গুলো আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যারা রয়েছেন, তাদেরকে প্রপার মাধ্যমে জানিয়েছি। আশা করি অতি শিগগিরই আমাদের এই সমস্যাগুলো সমাধান হয়ে যাবে।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, বরিশাল বিভাগের স্বাস্থ্যসেবার দীর্ঘদিনের সংকট নিরসনে দ্রুত চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, পর্যাপ্ত ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ, হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন। পাশাপাশি লিফট, বিদ্যুৎ, টয়লেটসহ রোগীবান্ধব মৌলিক সুবিধাগুলো নিশ্চিত করা জরুরি।
এসব পদক্ষেপ কার্যকর হলে দক্ষিণাঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য সরকারি স্বাস্থ্যসেবার মান ও প্রাপ্যতা আরও উন্নত করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Reporter Name 
















