চাঞ্চল্যকর সুরুজ গাজী হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারকৃত আসামি স্বর্ণ প্রতারক চক্রের মূলহোতা শাহীন হাওলাদার ওরফে সোনা শাহীন ও তার পরিবারের সদস্যরা মাত্র ছয় মাসের মধ্যে উচ্চ আদালত থেকে জামিনে বের হয়েছেন। নিহত সুরুজ গাজী বরিশাল মহানগরীর তিন নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের যুগ্ম আহবায়ক ছিলেন।
সোমবার (২৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে নিহতের ভাই মামলার বাদি শাহিন গাজী অভিযোগ করেন, জামিনে বেরিয়ে আসামিরা মামলা উত্তোলনের জন্য বিভিন্ন ধরনের হুমকি প্রদর্শনের পাশাপাশি তাদের (বাদি) পরিবার, জেলা যুবদলের এক নেতাসহ স্থানীয় ২৬ জনের বিরুদ্ধে উল্টো তিনটি মামলা দায়ের করেছেন।
বাদি শাহিন গাজী বলেন, আমার ভাইকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে ড্রিল মেশিন দিয়ে পেট ফুটো করে হত্যা করেছে শাহীনসহ তার স্ত্রী ও ছেলেরা। ঘটনার পর শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান চালিয়ে র্যাব, ডিবি ও পুলিশ সদস্যরা ঢাকাসহ বিভিন্নস্থানে পৃথক অভিযান চালিয়ে প্রধান আসামি সোনা শাহীনসহ অন্যান্য আসামিদের গ্রেপ্তার করেছেন। কিন্তু অতিসম্প্রতি আসামিরা হাইকোর্ট থেকে জামিনে বের হয়েছেন। তিনি আরও বলেন-একটি হত্যা মামলার আসামিরা সাজা না পেয়ে জামিনে বের হওয়ার ঘটনায় জনমনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
নগরীর ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউনিয়া এলাকার বাসিন্দা কাঞ্চন গাজীর ছেলে নিহত সুরুজের বোন ফরিদা বেগম অভিযোগ করে বলেন, চলতি বছরের ২ মার্চ ইফতারের পর তার ভাইকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। অভিযোগ করে তিনি বলেন, আমার ভাইয়ের হত্যাকারীরা জামিনে বের হয়ে মামলা উত্তোলনের জন্য বিভিন্ন ধরনের হুমকিসহ পাল্টা ঘরে আগুন দেয়ার অভিযোগ এনে তিনটি মামলা দায়ের করেছেন।
ফরিদা বেগম আরও জানান, তার ভাই সুরুজ গাজী নগরীর ৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের নেতা ছিলেন। স্থানীয় সাধারণ মানুষ তাকে ভীষণ ভালোবাসতেন। তাকে প্রকাশ্যে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যার ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষুব্ধ হয়ে প্রতারক শাহীনের ঘরে আগুন দিয়েছে। শাহীনের পুরো পরিবারটি একটি অপরাধ জগত দাবি করে তিনি বলেন-সাধারণ মানুষকে ধোকা দিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেয়াই তাদের প্রধান পেশা। বিগত ২০ বছর যাবত তারা এই প্রতারণা করে আসছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, শাহীনের একটি বিশাল স্বর্ণ প্রতারক চক্র রয়েছে। তারা রিকশাচালক সেজে এসব প্রতারনার কাজ করেন। ফলে অনেক আগ থেকেই স্থানীয়রা শাহীন ও তার পরিবারের ওপর চরম ক্ষুব্ধ ছিলেন। তার ওপর সুরুজ গাজীকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার বিষয়টি মেনে নিতে পারেনি স্থানীয়রা। ফলে শাহীনের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ক্ষুব্ধ জনতা তার বসত ঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে।
সূত্রমতে, এ ঘটনার পরেরদিন র্যাব, ডিবি এবং পুলিশ সদস্যরা পৃথক অভিযান চালিয়ে চাঞ্চল্যকর সুরুজ গাজী হত্যা মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার করে। কিন্তু মাত্র ছয়মাসের ব্যবধানে উচ্চ আদালত থেকে অতিসম্প্রতি আসামিরা জামিনে বের হওয়ার ঘটনায় জনমনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি উল্টো মামলা দায়েরের ঘটনায় এলাকাবাসী শাহীনের পরিবারের ওপর ফের ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন।
সূত্রমতে, শাহীনের দায়ের করা তিনটি মামলায় আসামি করা হয়েছে বরিশাল দক্ষিণ জেলা যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক উলফাত রানা রুবেলসহ বেশ কয়েকজনকে। আদালতের বিচারক পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন পিবিআইকে মামলাটি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
উল্লেখ্য, অভিযুক্ত স্বর্ণ প্রতারক চক্রের মূলহোতা শাহীন হাওলাদার নগরীর ৩ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের আহবায়ক ছিলেন। এলাকায় আধিপত্য ও শাহীনের স্বর্ণ প্রতারনার কাজে বাঁধা দেয়ার ক্ষিপ্ত হয়ে চলতি বছরের ২ মার্চ ইফতারের পর কাউনিয়া শেরে বাংলানগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পেছনের রাস্তায় প্রকাশ্যে সুরুজকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করে শাহীন হাওলাদার, তার স্ত্রী শাবানা বেগম, ছেলে লিয়ন, ইমরানসহ তাদের অন্যান্য সহযোগিরা।
এ সময় সুরুজ গাজীকে রক্ষায় এগিয়ে আসলে হামলাকারীরা একই এলাকার তসলিম গাজীর ছেলে ছাত্রদল নেতা নয়ন গাজীকে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করে। এ ঘটনার পর এলাকাবাসী ক্ষিপ্ত হয়ে দুই দফায় অভিযুক্ত সোনা শাহীনের কাউনিয়ার বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। সুরুজ গাজীকে হত্যার ঘটনায় তার ভাই শাহিন গাজী বাদি হয়ে কাউনিয়া থানায় শাহীন হাওলাদার ওরফে সোনা শাহীনকে প্রধান আসামি করে তার স্ত্রী, দুই ছেলেসহ সাতজনের নামোল্লেখ করে হত্যা মামলা দায়ের করেন।
অপরদিকে সুরুজ হত্যায় সকল আসামিকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে বরিশাল জেলা যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক উলফাত রানা রুবেলের নেতৃত্বে এলাকাবাসী মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছিলেন। যেকারণেই আসামিরা জামিনে বের হয়ে ওই যুবদল নেতাসহ অন্যান্যদের আসামি করে তিনটি মামলা দায়ের করেন।
এ দিকে মামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে বরিশাল জেলা যুবদল।
২৪ সেপ্টেম্বর এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, যুবদল কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাবেক সহ-সভাপতি ও বরিশাল দক্ষিণ জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এইচ. এম. তসলিম উদ্দিন এবং ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মামুন রেজা খান এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বরিশাল মহানগর ৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সুরুজ গাজীর হত্যাকাণ্ডের মামলা বর্তমানে বরিশাল বিজ্ঞ মেট্রোপলিটন আদালতে বিচারাধীন। সেই মামলার ৪ নম্বর আসামি শ্রমিক লীগের সদস্য ইমরান হোসেন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ষড়যন্ত্র করে যুবদল নেতা উলফাত রানা রুবেলকে মিথ্যা মামলায় জড়িয়েছেন। বিজ্ঞপ্তিতে যুবদল নেতারা দ্রুত ষড়যন্ত্রকারী ইমরান হোসেনকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
এ বিষয়ে যুবদল নেতা উলফাত রানা রুবেল বলেন, “ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত বরিশাল মহানগর ৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সুরুজ গাজীর হত্যাকাণ্ডের সত্যকে ধামাচাপা দিতে এবং আমাদের আন্দোলনকে দমিয়ে রাখতে এ ধরনের ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে আমাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর চেষ্টা চলছে।” এমনকি তারা মামলা তুলে নিতে মীমাংসার প্রস্তাব দিচ্ছে আমাদেরকে।
অন্যদিকে স্থানীয়দের প্রশ্ন—যেখানে প্রকাশ্যে যুবদল নেতাকে হত্যা করা হয়েছে, সেখানে আসামিরা এত দ্রুত জামিন পেল কীভাবে? আর উল্টো মামলার নামে বাদি পরিবার ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানির ঘটনা এলাকায় আবারো উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে।