বরিশালে ব্যর্থ মাদকবিরোধী অভিযান,ডিএনসি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে টাকা চুরির অভিযোগ
- প্রকাশের সময়: 09:43:55 pm, Friday, 23 October 2026
- / 85 Time View

নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল: মাদক উদ্ধারে গিয়ে ব্যর্থ অভিযান, শয্যাশায়ী এক ব্যক্তির চিকিৎসার জন্য রাখা টাকা চুরির অভিযোগ, মাদক মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে দুই দফায় ১ লাখ ১০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ এবং তরুণীর ব্যক্তিগত মুঠোফোন নম্বর সংগ্রহ করে গভীর রাতে ফোন দিয়ে অন্য এক তরুণীর নম্বর চাওয়ার অভিযোগ—একের পর এক গুরুতর অভিযোগে বিতর্কের মুখে পড়েছে বরিশালের গৌরনদী সার্কেলের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)।
অভিযোগ উঠেছে, মাদকবিরোধী অভিযানের নামে উজিরপুরের প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে একটি অসুস্থ ব্যক্তির বসতঘরে তল্লাশি চালান সাদা পোশাকধারী ডিএনসি সদস্যরা। কিন্তু দীর্ঘ তল্লাশিতেও মেলেনি কোনো মাদকদ্রব্য। উল্টো পরিবারের অভিযোগ, তল্লাশির সুযোগে বালিশের নিচে রাখা চিকিৎসার ১৫ হাজার টাকা নিয়ে যান অভিযানে অংশ নেওয়া সদস্যরা। এর আগে মাদক মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে দুই দফায় আরও ১ লাখ ১০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি পরিবারের।
শুধু তাই নয়, অভিযানের ভিডিও ধারণ করায় স্থানীয়দের মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে ভিডিও মুছে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এ সময় এক তরুণীর ফোন থেকে ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও নেওয়ার চেষ্টা এবং পরে আরেক তরুণীর মাধ্যমে ওই তরুণীর ফোন নম্বর সংগ্রহ করে গভীর রাতে ফোন দেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। ফোনে ওই তরুণীকে পছন্দ হওয়ার কথা জানিয়ে নম্বর চাওয়া এবং তা না দিলে পরদিন বাড়িতে মাদকবিরোধী অভিযান চালানোর হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করেছেন এক স্থানীয় তরুণী।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সকাল পৌনে ৮টার দিকে বরিশাল জেলার উজিরপুর উপজেলার প্রত্যন্ত বিলাঞ্চল জল্লা ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী ওড়াবাশবাড়ি গ্রামের কামরুজ্জামান কালুর বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর ক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর তোপের মুখে দীর্ঘ সময় ঘটনাস্থলে অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকতে হয় সাদা পোশাকে আসা ডিএনসি সদস্যদের।
তবে টাকা চুরি ও অর্থ আদায়ের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া কর্মকর্তা। অন্যদিকে, তরুণীর ফোন নম্বর সংগ্রহ করে গভীর রাতে ফোন দেওয়ার অভিযোগকে ‘ঘৃণ্যতম কাজ’ উল্লেখ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। ডিএনসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সকাল পৌনে ৮টার দিকে উজিরপুরের জল্লা ইউনিয়নের ওড়াবাশবাড়ি গ্রামের কামরুজ্জামান কালুর বাড়িতে মাদক উদ্ধারের অভিযান চালাতে যান পাঁচ সদস্যের একটি সাদা পোশাকধারী দল। প্রথমে নিজেদের পরিচয় না দিলেও স্থানীয়দের প্রশ্ন ও চাপের মুখে তারা গৌরনদী সার্কেলের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সদস্য বলে পরিচয় দেন।
পরে স্থানীয়দের উপস্থিতিতে কালুর বসতঘরে তল্লাশি চালান ডিএনসির গৌরনদী সার্কেলের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. ফাইজুল ইসলাম হাওলাদার এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন দলের সদস্য সিপাহি খাইরুল ইসলাম, রুবেল হোসেনসহ অন্যরা। কিন্তু তল্লাশি চালিয়েও ঘর থেকে কোনো মাদকদ্রব্য উদ্ধার করতে পারেননি তাঁরা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কামরুজ্জামান কালু একসময় মাদক সেবন করলেও প্রায় পাঁচ থেকে ছয় বছর আগে তা ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। বর্তমানে তিনি দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী। এমন একজন অসুস্থ ব্যক্তির বাড়িতে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে কী উদ্দেশ্যে অভিযান চালানো হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এলাকাবাসী।
ভুক্তভোগী কালুর স্ত্রী সুখী বেগমের অভিযোগ, বৃহস্পতিবার সকাল ৮টার আগেই ডিএনসির এসআই ফাইজুল ইসলাম, হৃদয়সহ চার থেকে পাঁচজন তাঁদের বাড়িতে আসেন। প্রথমে তাঁকে ডেকে নিয়ে অসুস্থ স্বামীকে মাদক মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে ২০ হাজার টাকা দাবি করা হয়।
সুখী বেগমের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযানে আসা ব্যক্তিরা তাঁকে বলেন, “কালু ভালো হয়ে গেছে তাতে কী হয়েছে, ডোপ টেস্ট করলে যত বছর আগেই মাদক সেবন করছে তা বের হয়ে যাবে; এরপর ওরে মামলায় দিবো।”
তিনি দাবি করেন, টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় তাঁকে ও তাঁর মেয়েকে অপমানজনক আচরণের শিকার হতে হয় এবং বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি দেখানো হয়। পরিস্থিতি দেখে আশপাশের লোকজন তাঁদের বাড়িতে জড়ো হতে থাকেন। একপর্যায়ে অভিযানের নেতৃত্বে থাকা কর্মকর্তা ঘরে তল্লাশি চালানোর কথা জানান।
পরে স্থানীয়রা গ্রাম পুলিশ নাজির হোসেনকে ফোন করে ঘটনাস্থলে নিয়ে আসেন। তাঁর উপস্থিতিসহ স্থানীয়দের সামনে বসতঘরে তল্লাশি চালানো হলেও কোনো অবৈধ মাদকদ্রব্য পাওয়া যায়নি বলে দাবি পরিবারের।
সুখী বেগমের অভিযোগ, ঘরে তল্লাশির সময় তাঁর শয্যাশায়ী স্বামীর বিছানায় বালিশের নিচে চিকিৎসার জন্য রাখা ১৫ হাজার টাকা নিয়ে যান ডিএনসির সদস্যরা। অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসার জন্য জমানো ওই টাকা হারিয়ে পরিবারটি চরম বিপাকে পড়েছে বলে জানান তিনি।
ক্ষুব্ধ সুখী বেগম বলেন, তাঁর স্বামী কোনো মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নন। দীর্ঘদিন আগে মাদক সেবন ছেড়ে দেওয়া একজন অসুস্থ মানুষকে মাদক মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখানো এবং তাঁর চিকিৎসার টাকা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। তিনি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
পরিবারটির আরও অভিযোগ, বৃহস্পতিবারের অভিযানের আগেও গত এক মাসে দুই দফায় মাদক মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে তাঁদের কাছ থেকে মোট ১ লাখ ১০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। তবে এ অর্থ আদায়ের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া এসআই ফাইজুল ইসলাম।
অভিযান চলাকালে স্থানীয় কয়েকজন মুঠোফোনে ভিডিও ধারণ করছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময় তাঁদের ফোন কেড়ে নিয়ে ধারণ করা ভিডিও মুছে দেওয়া হয় বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা। ফোন কেড়ে নেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক তরুণীর সঙ্গে ডিএনসি সদস্যদের বাগ্বিতণ্ডা ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।
অভিযোগ উঠেছে, সিপাহি খাইরুল ইসলাম ওই তরুণীর ফোন কেড়ে নিয়ে ভিডিও মুছে দেওয়ার অজুহাতে তাঁর ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও নেওয়ার চেষ্টা করেন। এ অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এখনো পাওয়া যায়নি। তবে ঘটনাটি ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
শুক্রবার সকালে স্থানীয় আরেক তরুণী অভিযোগ করেন, ভিডিও মুছে দেওয়ার সময় সিপাহি খাইরুল ইসলাম তাঁর মুঠোফোন নম্বর সংগ্রহ করেন। বৃহস্পতিবার দিবাগত গভীর রাতে নিজের পরিচয় দিয়ে খাইরুল তাঁকে ফোন করেন এবং আগের দিন যাঁর ফোন কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, সেই তরুণীর নম্বর চান।
ওই তরুণীর দাবি, ফোনে খাইরুল ইসলাম বলেন, “ওই মেয়েকে আমার পছন্দ হয়েছে, ওর মোবাইল নাম্বারটা আমাকে দেন। যদি না দেন আমরা আগামীকাল (শুক্রবার) সকালে এসে আপনাদের বাড়ি-ঘরে মাদকবিরোধী অভিযান চালাবো।”
অভিযোগটি সত্য হলে, আইন প্রয়োগের দায়িত্বে থাকা একজন কর্মকর্তার এমন আচরণ ক্ষমতার অপব্যবহার, ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ এবং অভিযানের ভয় দেখিয়ে চাপ সৃষ্টির গুরুতর প্রশ্ন সামনে আনে। তবে অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী গ্রাম পুলিশ নাজির হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, কালুর বাড়িতে সাদা পোশাকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা এসেছিলেন। পরে স্থানীয়রা ফোন করলে তিনি ঘটনাস্থলে যান। তবে কালুর ঘর থেকে কোনো মাদকদ্রব্য উদ্ধার হয়নি বলে জানান তিনি।
অভিযান পরিচালনার বিষয়টি নিশ্চিত করে ডিএনসি গৌরনদী সার্কেলের উপপরিদর্শক মো. ফাইজুল ইসলাম হাওলাদার বলেন, কামরুজ্জামান কালুর বসতঘর তল্লাশি করে কোনো মাদকদ্রব্য পাওয়া যায়নি। তাঁর ভাষায়, “আমরা সেখানে একটি নিষ্ফল অভিযান করেছি।”
তবে বসতঘর তল্লাশির সময় ১৫ হাজার টাকা চুরি এবং এর আগে দুই দফায় ১ লাখ ১০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ তিনি পুরোপুরি অস্বীকার করেন।
অন্যদিকে, তরুণীর ফোন নম্বর সংগ্রহ করে গভীর রাতে ফোন দেওয়া এবং অন্য তরুণীর নম্বর চাওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে এসআই ফাইজুল ইসলাম বলেন, সিপাহি খাইরুলের এ ধরনের কাজ সত্যিই ‘ঘৃণ্যতম’। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
এ বিষয়ে বরিশাল মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. তানভীর হোসেন খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, গৌরনদী সার্কেল থেকে সকালে একটি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। তবে সেটি উজিরপুরে হয়েছে কি না, তা তাঁর জানা নেই।
অভিযানের সময় টাকা চুরি এবং মাদক মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে দুই দফায় লক্ষাধিক টাকা নেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, খোঁজখবর নিয়ে বিস্তারিত জানাবেন। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সূত্রের দাবি, ডিএনসি বরিশালের উপপরিদর্শক মো. ফাইজুল ইসলাম হাওলাদার দীর্ঘ প্রায় সাত বছর ধরে গৌরনদী সার্কেলে দায়িত্ব পালন করছেন। স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ রয়েছে, একই স্টেশনে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের সুযোগে তাঁর নেতৃত্বাধীন দলের সদস্যরা সাদা পোশাকে আগৈলঝাড়া ও উজিরপুরের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করেন এবং অর্থ আদায় করেন।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা নথি বা তদন্তের ফলাফল পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।
মাদকবিরোধী অভিযানের উদ্দেশ্য অপরাধ দমন ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু কোনো অভিযানে মাদক না পাওয়া, অসুস্থ ব্যক্তির চিকিৎসার টাকা চুরির অভিযোগ, ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের দাবি এবং নারীর ব্যক্তিগত ফোন নম্বর ব্যবহার করে গভীর রাতে যোগাযোগের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
ওড়াবাশবাড়ির ঘটনায় অভিযোগগুলো সত্য কি না, তা নির্ধারণে অভিযানের নথি, সংশ্লিষ্ট সদস্যদের বক্তব্য, ফোনকলের তথ্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি এবং অর্থ লেনদেনসংক্রান্ত প্রমাণ যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তদন্তের অগ্রগতি প্রকাশ করা উচিত।
অভিযানটি যে নিষ্ফল হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নিজেই স্বীকার করেছেন। এখন প্রশ্ন—অভিযান ব্যর্থ হওয়ার পাশাপাশি যেসব গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর জবাবদিহি কে নিশ্চিত করবে? ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয়দের দাবি, শুধু আশ্বাস নয়, অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং প্রমাণিত অপরাধের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা দেখতে চান তাঁরা।






















