ঝরে পড়ার হার ৫০.৫০%
বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে এক দশকে ঝরে পড়েছে প্রায় ৪ লাখ শিক্ষার্থী
- প্রকাশের সময়: 04:20:31 am, Sunday, 18 October 2026
- / 41 Time View

নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল: স্কুলের গণ্ডি পেরিয়েও উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে না বরিশাল বিভাগের হাজারো শিক্ষার্থীর। বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এক দশকে জেএসসি থেকে এইচএসসি পর্যন্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে প্রায় ৪ লাখ। বিশেষ করে মাধ্যমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিকে উত্তরণের পর্যায়ে শিক্ষার্থী কমার হার সবচেয়ে বেশি।
শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার পেছনে দারিদ্র্য ও আর্থিক সংকট, পড়াশোনার ব্যয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানে যুক্ত হওয়া, বাল্যবিয়ে, যাতায়াত সমস্যা, পড়াশোনায় অনাগ্রহ, অনিয়মিত উপস্থিতি এবং করোনাকালে শিক্ষার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়াসহ বিভিন্ন কারণকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের ২০১১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ব্যাচভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, জেএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১০ লাখ ৩৪ হাজার ৭৮৫ শিক্ষার্থীর মধ্যে পরবর্তী সময়ে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ৬ লাখ ৩৮ হাজার ২০১ জন। অর্থাৎ দুই পরীক্ষার মধ্যে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কমেছে ৩ লাখ ৯৬ হাজার ৫৮৪ জন।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জেএসসি থেকে এসএসসি পর্যায়ে শিক্ষার্থী কমেছে ৯৮ হাজার ৪৬০ জন। অন্যদিকে এসএসসি থেকে এইচএসসি পর্যায়ে কমেছে ২ লাখ ৯৮ হাজার ১২৪ জন। এতে মাধ্যমিকের পর উচ্চমাধ্যমিকে যাওয়ার পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার প্রবণতা বেশি বলে প্রতীয়মান হয়।
করোনাকালীন ২০২০ সালের ব্যাচে ঝরে পড়ার হার ৫০.৫০ শতাংশ
সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র দেখা গেছে ২০২০ সালের জেএসসি ব্যাচে। ওই বছর জেএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় ১ লাখ ১৯ হাজার ৬৮৫ জন শিক্ষার্থী। ২০২৩ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় ৯০ হাজার ২০০ জন। এ পর্যায়ে শিক্ষার্থী কমে ২৯ হাজার ৪৮৫ জন বা ২৪ দশমিক ৬৪ শতাংশ।
পরবর্তী সময়ে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় ৫৯ হাজার ২৪৫ জন। এসএসসি থেকে এইচএসসি পর্যায়ে শিক্ষার্থী কমে আরও ৩০ হাজার ৯৫৫ জন বা ৩৪ দশমিক ৩২ শতাংশ।
সব মিলিয়ে জেএসসি থেকে এইচএসসি পর্যন্ত ওই ব্যাচে পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কমেছে ৬০ হাজার ৪৪০ জন বা ৫০ দশমিক ৫০ শতাংশ। অর্থাৎ জেএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রতি ১০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ৫০ জনকে পরবর্তী এইচএসসি পরীক্ষায় দেখা যায়নি।
এক দশকে দ্বিগুণ হয়েছে শিক্ষার্থী কমার হার
বোর্ডের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১১ সালের ব্যাচে জেএসসি থেকে এইচএসসি পর্যন্ত শিক্ষার্থী কমার হার ছিল ২৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ। ২০২০ সালের ব্যাচে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ দশমিক ৫০ শতাংশে। অর্থাৎ এক দশকের ব্যবধানে এ হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিবারের আর্থিক সংকট, আয় কমে যাওয়া, শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি এবং দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের উপার্জনের কাজে যুক্ত হওয়া শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এ ছাড়া বাল্যবিয়ে, যাতায়াতের অসুবিধা ও পড়াশোনায় অনিয়মিত হয়ে পড়াও শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বরিশাল সচেতন নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব ডা. মিজানুর রহমান বলেন, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার পেছনে আর্থিক সংকট, পরিবারের আয় কমে যাওয়া, বাল্যবিয়ে, শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি এবং দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের কাজে যুক্ত হয়ে পড়া বড় কারণ। মাধ্যমিকের পর উচ্চমাধ্যমিকে পড়াশোনার ব্যয়ও অনেক পরিবারের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করে।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে প্রতিটি শিক্ষার্থীর শিক্ষা অব্যাহত রাখতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক শরিফ মোর্শেদ রেজা বলেন, শিক্ষার্থীরা কেন পরীক্ষার ধারাবাহিকতায় থাকছে না, তা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। এ লক্ষ্যে তাঁরা সমন্বিতভাবে কার্যক্রম চালানোর উদ্যোগ নিয়েছেন।
শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা, আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং মাধ্যমিকের পর উচ্চমাধ্যমিকে পড়াশোনা অব্যাহত রাখতে সহায়তা বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
























