৬৩ হাজার শিক্ষার্থীর আসন মাত্র ১,৮০০
বরিশালে হাজারো শিক্ষার্থীর আবাসনসংকট, সরকারি কলেজগুলোতে নেই পর্যাপ্ত হল
- প্রকাশের সময়: 07:46:08 am, Thursday, 15 October 2026
- / 24 Time View

নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল: বরিশাল নগরীর চারটি সরকারি কলেজে উচ্চশিক্ষা নিতে আসা শিক্ষার্থীদের বড় অংশই আবাসনসংকটে ভুগছেন। প্রায় ৬৩ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে কলেজগুলোর আবাসিক আসন রয়েছে মাত্র ১ হাজার ৮০০টি। ফলে ৯৭ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থীকে হলের বাইরে থেকে পড়াশোনা করতে হচ্ছে। এতে বাড়তি আবাসন ব্যয়ের চাপের পাশাপাশি নিয়মিত ক্লাসে অংশগ্রহণেও সমস্যায় পড়ছেন অনেকে। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসনের অভাব উচ্চশিক্ষার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কলেজগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সরকারি ব্রজমোহন কলেজে প্রায় ৩২ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে আবাসিক আসন রয়েছে ১ হাজার ২০০টি। সরকারি বরিশাল কলেজে প্রায় ৯ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য কোনো আবাসিক ব্যবস্থা নেই। সরকারি সৈয়দ হাতেম আলী কলেজে প্রায় ১১ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে আসন রয়েছে ১০০টির কিছু বেশি। অন্যদিকে, বরিশাল সরকারি মহিলা কলেজে প্রায় ১১ হাজার ছাত্রীর জন্য আবাসিক আসন রয়েছে মাত্র ৫০০টি।
ব্রজমোহন কলেজে ছয় হল জরাজীর্ণ, ৩৭ বছরে নির্মিত হয়নি নতুন হল
বরিশালের সরকারি কলেজগুলোর মধ্যে শিক্ষার্থীসংখ্যায় সবচেয়ে বড় সরকারি ব্রজমোহন কলেজ। প্রতিষ্ঠানটিতে ২২টি বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) এবং ২১টি বিষয়ে স্নাতকোত্তর কার্যক্রম চালু রয়েছে। প্রায় ৩২ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য আবাসিক আসন রয়েছে মাত্র ১ হাজার ২০০টি।
কলেজটিতে ছয়টি আবাসিক হল থাকলেও সেগুলোর অধিকাংশই জরাজীর্ণ। কোনো কোনো হলে ধারণক্ষমতার তুলনায় বেশি শিক্ষার্থীকে থাকতে হচ্ছে। শিক্ষার্থীসংখ্যা ও শিক্ষাক্রম বাড়লেও গত ৩৭ বছরে নতুন কোনো আবাসিক হল নির্মিত হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
আবাসনসংকটের কারণে অনেক শিক্ষার্থীকে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় মেস কিংবা ভাড়া বাসায় থাকতে হচ্ছে। এতে পড়াশোনার খরচ বাড়ছে এবং নিয়মিত ক্লাসে অংশগ্রহণও কঠিন হয়ে পড়ছে।
কলেজটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী জুনায়েদ আহমেদ বলেন, “শুধু নতুন আবাসিক হল নির্মাণ নয়, বিদ্যমান হলগুলোও দ্রুত সংস্কার ও আধুনিকায়ন করতে হবে।”
কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কাজী জাবের আহমেদ বলেন, “আবাসিক হলগুলোর অবস্থা নাজুক। সেগুলো সংস্কারের জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আবাসনসংকট নিরসনেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।”
সরকারি বরিশাল কলেজে আবাসিক হল নেই
নগরীর সরকারি বরিশাল কলেজে উচ্চমাধ্যমিক থেকে স্নাতকোত্তর পর্যায় পর্যন্ত প্রায় ৯ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। কিন্তু তাঁদের জন্য কলেজটিতে কোনো আবাসিক ব্যবস্থা নেই।
ফলে দূরবর্তী এলাকা থেকে আসা শিক্ষার্থীদের মেস কিংবা ভাড়া বাসায় থাকতে হচ্ছে। এতে বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে। অনেকের জন্য এ ব্যয় বহন করে উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ছে।
কলেজটির অধ্যক্ষ ড. মো. মহিউদ্দিন বলেন, এ প্রতিষ্ঠানে ছেলেদের তুলনায় মেয়েশিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি। তাঁদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অন্তত একটি আবাসিক হল নির্মাণ করা জরুরি। আবাসনের অভাবে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হারও কম বলে জানান তিনি।
অধ্যক্ষের ভাষ্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে পরীক্ষায় অংশ নিতে অন্তত ৬০ শতাংশ ক্লাসে উপস্থিত থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ কারণে বরিশালের বাইরের শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাস করার জন্য নগরীতে থাকার প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে।
সৈয়দ হাতেম আলী কলেজে ১১ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য শতাধিক আসন
সরকারি সৈয়দ হাতেম আলী কলেজে উচ্চমাধ্যমিক, বিএ, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায় মিলিয়ে প্রায় ১১ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছেন। তাঁদের জন্য আবাসিক আসন রয়েছে ১০০টির কিছু বেশি।
ফলে অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে হলের বাইরে থেকে পড়াশোনা করতে হচ্ছে। তাঁদের অনেকেই মেস কিংবা ভাড়া বাসায় থাকছেন। এতে আবাসন ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে শিক্ষার্থীরা আর্থিক চাপে পড়ছেন।
কলেজটির অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান খান বলেন, “প্রায় ১১ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে আবাসিক আসন ১০০টির কিছু বেশি, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। সংকট নিরসনে নতুন একটি আবাসিক হল নির্মাণের জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হবে।”
মহিলা কলেজে ১১ হাজার ছাত্রীর জন্য ৫০০ আসন
বরিশাল সরকারি মহিলা কলেজে প্রায় ১১ হাজার ছাত্রী উচ্চমাধ্যমিক থেকে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়াশোনা করছেন। তাঁদের জন্য আবাসিক আসন রয়েছে মাত্র ৫০০টি। অর্থাৎ, প্রায় ১০ হাজার ৫০০ ছাত্রীকে হলের বাইরে থেকে পড়াশোনা করতে হচ্ছে।
দূরবর্তী এলাকা থেকে আসা ছাত্রীদের জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসন পাওয়া বড় চ্যালেঞ্জ। অনেককে মেস কিংবা ভাড়া বাসায় থাকতে হচ্ছে। এতে বাড়তি ব্যয়ের পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের মতে, নারী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণ বাড়াতে নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু বর্তমান আসনসংখ্যা চাহিদার তুলনায় অনেক কম হওয়ায় তাঁদের বড় অংশকে বিকল্প আবাসনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
নতুন হল নির্মাণ ও সংস্কারের দাবি
চারটি সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রতিবছর শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও আবাসন সুবিধা সেই অনুপাতে বাড়ানো হয়নি। কোথাও প্রয়োজনের তুলনায় আসন কম, কোথাও আবার আবাসিক ব্যবস্থাই নেই। বিদ্যমান হলগুলোর সংস্কার ও আধুনিকায়নের অভাবেও সংকট জটিল হচ্ছে।
সরকারি ব্রজমোহন কলেজ ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ওয়ালিদ বিন সালাউদ্দিন বলেন, “শিক্ষার্থীদের থাকার জন্য হলে পর্যাপ্ত আসন নেই। আবার অনেকের পক্ষে মেসের খরচ বহন করাও সম্ভব নয়। এর মধ্যে বিদ্যমান হলগুলোর অবস্থাও ঝুঁকিপূর্ণ। এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেই শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হচ্ছে।”
শিক্ষার্থীদের দাবি, আবাসনসংকটের স্থায়ী সমাধানে নতুন আবাসিক হল নির্মাণ, পুরোনো হল সংস্কার ও আধুনিকায়ন এবং নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। তাঁদের মতে, আবাসনের সুযোগ বাড়ানো গেলে নিয়মিত ক্লাসে অংশগ্রহণ সহজ হবে এবং উচ্চশিক্ষার পরিবেশও উন্নত হবে।
























