আধুনিকায়ন হচ্ছে বরিশাল স্টেডিয়াম, শুরু হচ্ছে বড় ক্রিকেট আয়োজন
- প্রকাশের সময়: 07:46:45 am, Saturday, 7 November 2026
- / 66 Time View

নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল :বরিশালের কবি জীবনানন্দ দাশ স্টেডিয়ামের আধুনিকায়নে ব্যয় হয়েছে ৬৫ কোটি টাকা। পাঁচ বছর ধরে চলা সংস্কারকাজে নতুন রূপ পেয়েছে স্টেডিয়ামটি। আধুনিক প্যাভিলিয়ন, নতুন চেয়ার, মিডিয়া ভবন, হোস্টেল ও ফ্লাডলাইট স্থাপনের মধ্য দিয়ে বড় ক্রিকেট আয়োজনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে এই ভেন্যু। আগামী ১৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নতুন প্রতিযোগিতা ‘ডোমেস্টিক থ্রি’ বা ‘ডি-থ্রি’র টি-টুয়েন্টি টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার কথা রয়েছে এখানে।
কীর্তনখোলা নদীর তীরে নগরের বান্দরোডে অবস্থিত এই স্টেডিয়ামে বড় পরিসরে ক্রিকেট আয়োজনকে ঘিরে আশাবাদী স্থানীয় ক্রীড়াপ্রেমীরা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, এই আয়োজন বরিশাল অঞ্চলের ক্রিকেটে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে শুধু আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ করলেই স্থানীয় ক্রিকেটের সংকট কাটবে না। নিয়মিত টুর্নামেন্ট, প্রশিক্ষণের সুযোগ, অনুশীলনের মাঠ, স্বচ্ছ খেলোয়াড় নির্বাচন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপরও জোর দিচ্ছেন ক্রিকেটার ও সংগঠকেরা।
১৫ ডিসেম্বর শুরু হচ্ছে ডি-থ্রি টুর্নামেন্ট
বিসিবির সূচি অনুযায়ী, আগামী ১৫ ডিসেম্বর টি-টুয়েন্টি সংস্করণের মধ্য দিয়ে শুরু হবে ডি-থ্রি টুর্নামেন্ট। উদ্বোধনী পর্বের ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত হবে বরিশালের কবি জীবনানন্দ দাশ স্টেডিয়াম এবং ঢাকার মিরপুরে শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে।
ছয়টি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতায় ছয়টি দল এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে। দলগুলো হলো ব্লুস্টার, ওয়ালটন গ্রুপ, সিটিজেনস ব্যাংক, একমি গ্রুপ, সেভেন রিংস সিমেন্ট ও ফরচুন গ্রুপ।
প্রতিটি দল একজন করে আইকন ক্রিকেটার নির্বাচন করেছে। ওয়ালটনের আইকন মেহেদী হাসান মিরাজ, ফরচুন গ্রুপের তাওহিদ হৃদয়, একমি গ্রুপের মোসাদ্দেক হোসেন, সেভেন রিংস সিমেন্টের মুশফিকুর রহিম, ব্লুস্টারের নুরুল হাসান এবং সিটিজেনস ব্যাংকের মোহাম্মদ নাঈম শেখ।
এই টুর্নামেন্টের অন্যতম লক্ষ্য ঘরোয়া ক্রিকেটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ানো এবং ক্রিকেটারদের তিন সংস্করণেই খেলার সুযোগ তৈরি করা।
স্থানীয় ক্রিকেটারদের সুযোগ বাড়ানোর দাবি
বরিশাল বিভাগীয় ক্রিকেট দলের সাবেক ক্রিকেটার ও স্থানীয় একটি ক্রিকেট একাডেমির কোচ এজাজ আল মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, স্টেডিয়ামের চাকচিক্য ও জৌলুশ বাড়ালেই হবে না, স্থানীয় খেলোয়াড়দের খেলার সুযোগ তৈরি করতে হবে। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিভাগ ক্রিকেট টুর্নামেন্ট নিয়মিত আয়োজন করা জরুরি। তা না হলে ভালো খেলোয়াড় তৈরি হবে না।
বিসিবির পরিচালক ও বরিশাল বিভাগের খেলোয়াড় নির্বাচনের সমন্বয়কারী মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ছয়টি দলের এই আসরে বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন এলাকার ক্রিকেটারদের যুক্ত করার চেষ্টা চলছে।
দীর্ঘদিন খেলোয়াড় তৈরি না হওয়া এবং মাঠের সংকটের কারণে বিভাগীয় দলের কাছ থেকে ভালো ফল আশা করা কঠিন বলে মনে করেন তিনি। তবে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে খেলোয়াড়দের অনুশীলন ও প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ভেন্যু হওয়ার সম্ভাবনা
আধুনিকায়নের ফলে বরিশালের এই স্টেডিয়ামে বড় ক্রিকেট আয়োজনের সম্ভাবনা বেড়েছে। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ আয়োজনের উপযোগী ভেন্যু হিসেবে গড়ে তুলতে আরও কিছু অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বিশেষ করে উন্নত আবাসন, নিয়মিত উড়োজাহাজ চলাচল, বড় টুর্নামেন্ট আয়োজনের উপযোগী পরিবেশ এবং স্থানীয় পর্যায়ে ক্রিকেটের শক্ত ভিত্তি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তাঁরা।
বরিশাল বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সদস্যসচিব আনোয়ারুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ঘরোয়া ক্রিকেট লিগ চালুর চেষ্টা চলছে। মাঠের সংকট কাটাতে স্টেডিয়ামের ভেতরে থাকা একটি পরিত্যক্ত সুইমিংপুল সরিয়ে সেখানে আলাদা খেলার মাঠ তৈরির বিষয়েও আলোচনা হচ্ছে।
৬৫ কোটি টাকার সংস্কারকাজে এখনো বাকি ৫ শতাংশ
কবি জীবনানন্দ দাশ স্টেডিয়ামের সংস্কারকাজ শুরু হয়েছিল ২০২১ সালে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি। প্রথম দফায় কাজের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। তবে নানা জটিলতায় সেই সময়ের মধ্যেও কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম এস কোহিনুর এন্টারপ্রাইজের সহকারী প্রকৌশলী মো. রায়হান গাজী বলেন, স্টেডিয়ামের প্রায় ৯৫ শতাংশ সংস্কারকাজ শেষ হয়েছে। বাকি কাজ ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে শেষ হবে বলে তাঁরা আশা করছেন।
গত ৩০ অক্টোবর স্টেডিয়াম ঘুরে দেখা যায়, গ্যালারিতে নতুন চেয়ার বসানো হয়েছে। সংস্কার করা হয়েছে প্যাভিলিয়ন ও মিডিয়া ভবন। নির্মাণ করা হয়েছে তিনতলা হোস্টেল। সচল রয়েছে ফ্লাডলাইটও।
বরিশাল বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থা সূত্রে জানা যায়, নতুন চেয়ার বসানোর পর স্টেডিয়ামের দর্শক ধারণক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজারে। আগে গ্যালারিতে কোনো চেয়ার ছিল না। তখন দর্শক ধারণক্ষমতা ছিল ৩৫ হাজার।
১৯৬৬ সালে ২৯ দশমিক ১৫ একর জমির ওপর বরিশাল স্টেডিয়াম প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০৬ সালে সংস্কারের পর ২০০৮ সালে এর নামকরণ করা হয় আবদুর রব সেরনিয়াবাত স্টেডিয়াম। পরে ২০২৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি স্টেডিয়ামটির নাম পরিবর্তন করে কবি জীবনানন্দ দাশ স্টেডিয়াম রাখা হয়।
নতুন প্রতিভা উঠে আসার পথ এখনো সীমিত
স্টেডিয়ামের সংস্কারকাজ শেষ হতে দীর্ঘ সময় লাগায় স্থানীয় ক্রীড়া সংগঠকদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। বিপুল অর্থ ব্যয়ে আধুনিক স্টেডিয়াম তৈরি হলেও স্থানীয় ক্রিকেটারদের নিয়মিত অনুশীলন ও প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ কতটা বাড়বে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বরিশাল ফরমার ক্রিকেটার্স ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মীর হাসান মোরশেদ বলেন, অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি খেলোয়াড় বাছাই ও দল পরিচালনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। খেলোয়াড় নির্বাচনের পাশাপাশি কোচ ও ম্যানেজার নিয়োগের ক্ষেত্রেও বিসিবির গঠনতন্ত্র যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে।
জেলা ক্রিকেট দলের সাবেক খেলোয়াড় জহিরুল ইসলাম বলেন, স্থানীয় ক্রিকেটারদের বেশি সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি দলের সুযোগ-সুবিধাও বাড়াতে হবে। বরিশালে নিয়মিত ক্রিকেট চর্চার জন্য আলাদা মাঠ নেই। মূল স্টেডিয়াম ক্রিকেট বোর্ডের অধীনে থাকায় সেখানে ঘরোয়া লিগ আয়োজনের সুযোগও সীমিত।
স্থানীয় ক্রীড়া সংগঠকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আধুনিকায়ন করা স্টেডিয়ামে স্থানীয় পর্যায়ের সীমিতসংখ্যক খেলোয়াড় খেলার সুযোগ পাবেন। একই মাঠে ক্রিকেট ও ফুটবল আয়োজনের বিষয়টিও রয়েছে। সম্প্রতি বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার নতুন কমিটি একটি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট সফলভাবে শেষ করেছে। এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তাঁরা।
সংগঠকদের ভাষ্য, এর আগে প্রায় এক যুগ বরিশাল বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার আয়োজনে ফুটবল কিংবা ক্রিকেট লিগ অনুষ্ঠিত হয়নি।
বরিশাল জেলা ক্রিকেট দলের খেলোয়াড় মাইনুল ইসলাম অভিযোগ করেন, প্রায় ১০ বছর ধরে এ অঞ্চলে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নতুন ক্রিকেটার তৈরি হয়নি। খেলোয়াড় নির্বাচনে পক্ষপাতের কারণে যোগ্য খেলোয়াড়েরা সুযোগ হারাচ্ছেন।
অভিযোগের বিষয়ে আনোয়ারুল হক বলেন, তাঁরা নতুন কমিটি হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। আগে যা হয়েছে, তা পুনরাবৃত্তির সুযোগ নেই। ভবিষ্যতে স্বচ্ছতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে কাজ করা হবে। ক্রীড়াঙ্গনে শৃঙ্খলা ও বিকাশের লক্ষ্যে তাঁরা কাজ করছেন।
অবকাঠামোর পাশাপাশি নিয়মিত ক্রিকেট চর্চার প্রত্যাশা
৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিকায়ন করা কবি জীবনানন্দ দাশ স্টেডিয়াম বরিশালের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ১৫ ডিসেম্বরের ডি-থ্রি টুর্নামেন্ট হতে পারে সেই সম্ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা।
তবে স্থানীয় ক্রিকেটের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য নিয়মিত বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের লিগ, বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতা, মানসম্মত প্রশিক্ষণ এবং যোগ্য খেলোয়াড় নির্বাচনের ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। আধুনিক স্টেডিয়ামের সুযোগ স্থানীয় ক্রিকেটারদের কাছে পৌঁছে দিতে পারলেই এই অবকাঠামোগত উন্নয়নের সুফল পাওয়া সম্ভব হবে।




















