কাউন্সিলরবিহীন বরিশাল সিটি করপোরেশন, নাগরিক সেবায় চরম ভোগান্তি
- প্রকাশের সময়: 03:17:10 am, Friday, 30 October 2026
- / 48 Time View

নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল: বরিশাল সিটি করপোরেশনে (বিসিসি) নির্বাচিত কাউন্সিলর না থাকায় নাগরিক সেবা পেতে ভোগান্তিতে পড়ছেন নগরবাসী। ওয়ারিশ সনদ, নাগরিকত্ব সনদ ও জন্মনিবন্ধনের মতো প্রয়োজনীয় সেবা পেতে অনেককে দিনের পর দিন ওয়ার্ড কার্যালয়ে ঘুরতে হচ্ছে। জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতিতে নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডের দায়িত্ব ১৬ জন সরকারি কর্মকর্তার ওপর ন্যস্ত করা হলেও নিয়মিত দাপ্তরিক কাজের পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন তাঁরা। এতে ব্যাহত হচ্ছে ওয়ার্ড পর্যায়ের নাগরিক সেবা কার্যক্রম।
নগরবাসীর অভিযোগ, কাউন্সিলর না থাকায় ওয়ার্ড কার্যালয়ে সেবা পাওয়ার প্রক্রিয়া আগের তুলনায় জটিল হয়ে পড়েছে। প্রয়োজনীয় সনদ সংগ্রহ করতে একাধিকবার কার্যালয়ে যেতে হচ্ছে। কখনো কর্মকর্তার ব্যস্ততা, কখনো কাগজপত্র যাচাইয়ের দীর্ঘসূত্রতায় জরুরি কাজে সেবা নিতে এসে বিপাকে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে চাকরির আবেদন, জমিসংক্রান্ত কাজ ও বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রয়োজনে সনদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সময়ের অপচয় হচ্ছে।
নগরীর ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সাব্বির গাজী বলেন, পাসপোর্ট তৈরির জন্য নাগরিকত্ব সনদ প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা না থাকায় একটি স্বাক্ষরের জন্য তাঁকে ১৭ দিন ঘুরতে হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, সনদ পেতে দেরি হওয়ায় অনেকের চাকরি বা অন্যান্য আবেদনের সময়সীমাও শেষ হয়ে যায়।
১৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আফসানা বলেন, স্বামীর মৃত্যু সনদ সংগ্রহ করতে তাঁকে এক সপ্তাহ ঘুরতে হয়েছে। প্রথমে সার্ভার বন্ধ থাকার কথা জানানো হয়। পরে সনদ প্রিন্ট হলেও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছুটিতে থাকায় তা পেতে আরও অপেক্ষা করতে হয়।
২৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম বলেন, মেয়ের জন্মনিবন্ধন করাতে গিয়ে জানতে পারেন, আগে বাবা-মায়ের জন্মনিবন্ধন অনলাইনে করতে হবে। নিজেদের জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন করার পর মেয়ের জন্য আবেদন করেন। জাতীয় পরিচয়পত্র থাকার পরও কেন অনলাইন জন্মনিবন্ধন প্রয়োজন, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
ওয়ারিশ সনদ পেতেও দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ রয়েছে। ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা রাইসুল ইসলাম বলেন, ওয়ারিশ সনদের জন্য আবেদন করার পর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা স্থানীয় বাসিন্দাদের ভালোভাবে না চেনায় তথ্য যাচাইয়ে দীর্ঘ সময় নিচ্ছেন। তাঁর মতে, নির্বাচিত কাউন্সিলর না থাকায় সাধারণ নাগরিকদের সেবা পেতে ভোগান্তি বাড়ছে।
নগরবাসীর ভাষ্য, কাউন্সিলর কার্যালয়ের কাজ শুধু সনদ দেওয়া বা প্রশাসনিক কাগজপত্রে স্বাক্ষরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জমিসংক্রান্ত বিরোধ, পারিবারিক সমস্যা ও ছোটখাটো বিরোধ স্থানীয়ভাবে মীমাংসায়ও জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা থাকে।
২৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ফারদিন বলেন, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে অপরিচিত হওয়ায় ওয়ার্ডে সালিশি কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে ছোটখাটো বিরোধেও অনেকে থানা বা আদালতের দ্বারস্থ হচ্ছেন। এতে সময় ও অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াও ব্যাহত হচ্ছে।
প্রায় ৫৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বরিশাল সিটি করপোরেশনে সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলরসহ মোট ৪০টি কাউন্সিলর পদ রয়েছে। তবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতিতে ওয়ার্ড পর্যায়ে নাগরিক সেবা পরিচালনার দায়িত্ব এখন সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভরশীল।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিটি করপোরেশনের পরিষদ ভেঙে দেওয়ার পর ওয়ার্ড পর্যায়ে নাগরিক সেবা সচল রাখার দায়িত্ব সরকারি কর্মকর্তাদের দেওয়া হয়। কিন্তু নিজ নিজ দপ্তরের নিয়মিত কাজের পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সব সময় ওয়ার্ড কার্যালয়ে উপস্থিত থাকা তাঁদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। এতে বিভিন্ন আবেদন ও নথিপত্র জমে থাকার পাশাপাশি সেবা নিতে আসা নাগরিকদের অপেক্ষাও দীর্ঘ হচ্ছে।
দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বলছেন, নিয়মিত দাপ্তরিক কাজের চাপ সামলেও তাঁরা নাগরিক সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। সেবা প্রদানে আন্তরিকতার ঘাটতি নেই; তবে কিছু সনদের তথ্য ও সত্যতা যাচাই করতে সময় প্রয়োজন হয়।
বরিশাল বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মীর মু. জাহিদুল কবির তুহিন বলেন, নাগরিকত্ব সনদ ও জন্মনিবন্ধনের জন্য বেশি মানুষ আসেন। তিনি প্রতিদিনের কাজ প্রতিদিন শেষ করার চেষ্টা করেন।
বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. মো. রেফায়েতুল হায়দার বলেন, সিটি করপোরেশন থেকে তাঁদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে তাঁরা সচেষ্ট। মূল দাপ্তরিক কাজের বাইরেও নাগরিক সেবার দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করছেন তাঁরা।
এ বিষয়ে বরিশাল সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রুম্পা সিকদার বলেন, নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে তাঁদের দপ্তর থেকে তদারকি আরও বাড়ানো হবে। কীভাবে নাগরিকদের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়া যায়, সে বিষয়ে তাঁরা বদ্ধপরিকর।
নগরবাসীর দাবি, নাগরিক সেবা নির্বিঘ্ন রাখতে পর্যাপ্ত জনবল নিশ্চিত করা, সনদ প্রদান ও অন্যান্য সেবার দীর্ঘসূত্রতা কমানো এবং ওয়ার্ড পর্যায়ে জবাবদিহি বাড়াতে কার্যকর প্রশাসনিক উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে ওয়ার্ড পর্যায়ে সেবা কার্যক্রম পরিচালনার ব্যবস্থার দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা।
























