বিশেষ প্রতিনিধি: বরিশালে পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর-এর ধারাবাহিক অভিযান, মাদক কারবারিদের গ্রেফতার এবং বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য উদ্ধারের পরও মাদকের বিস্তার রোধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। নগর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও এখন সহজলভ্য হয়ে উঠেছে ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল ও অন্যান্য মাদকদ্রব্য।
স্থানীয়দের ভাষায়, “হাত বাড়ালেই মাদক”—এই কথাটি এখন বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র ও স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, বরিশাল সিটি করপোরেশন-এর আওতাধীন ৩০টি ওয়ার্ডের প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ডেই একাধিক মাদক ব্যবসায়ী সক্রিয় রয়েছে। ফলে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্য ও গোপনে মাদক কেনাবেচা চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণা দেন, ১ মে থেকে সারা দেশে মাদক, অবৈধ অস্ত্র ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে বিশেষ যৌথ অভিযান শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশ, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, নৌ পুলিশ, বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে। তবে বরিশাল অঞ্চলে এখনো দৃশ্যমান বড় কোনো সাফল্য আসেনি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একের পর এক অভিযান, তবুও মাদক সহজলভ্য
চলতি সপ্তাহে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ-এর এয়ারপোর্ট ও কাউনিয়া থানা পৃথক অভিযানে ইয়াবা ও গাঁজাসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছে। এর মধ্যে টেকনাফ থেকে আসা জাহিদা বেগম (২০) নামে এক তরুণীকে ১ হাজার পিস ইয়াবাসহ আটক করা হয়।
এছাড়া কাউনিয়া থানার অভিযানে ৫৩ পিস ইয়াবা, ২৩ পিস ইয়াবা এবং ১০০ গ্রাম গাঁজাসহ একাধিক মাদক কারবারিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
অন্যদিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর-এর অভিযানে ১০৩ অ্যাম্পুল জি-মরফিন ইনজেকশন, প্রায় দেড় কেজি গাঁজা এবং ১,০৫৮ পিস ইয়াবা জব্দ করা হয়েছে। এ ঘটনায় কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করা হয়।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত বরিশাল রেঞ্জ পুলিশ-এর ৪৪টি থানা ও বরিশাল মহানগরের ৪টি থানায় মাদক-সংক্রান্ত ঘটনায় প্রায় সাড়ে ৩ হাজার ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ সময়ে দায়ের করা হয়েছে ৩ হাজার ৫৮টি মামলা।
একই সময়ে উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় ৭০০ কেজি গাঁজা, ৫০টির মতো গাঁজার গাছ, দুই লক্ষাধিক ইয়াবা ট্যাবলেট, সাড়ে ৮ হাজার লিটার চোলাই মদ, ২১১ লিটার দেশি মদ, ১২ বোতল বিদেশি মদ, প্রায় ২৫০ বোতল ফেনসিডিল, ২০০ গ্রাম হেরোইন এবং প্রায় ১ হাজার ২৫০টি মরফিন ও অন্যান্য নেশাজাতীয় ইনজেকশন। এছাড়া ২১ ক্যান বিদেশি বিয়ার এবং মাদক বিক্রির প্রায় ৭ লাখ ২২ হাজার টাকা জব্দ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সড়কপথে পুলিশের নজরদারি বাড়লেও নৌপথ এখনো মাদক পাচারের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ। নৌ পুলিশ ও জেলা পুলিশের নৌযান সংকট, জনবল সীমাবদ্ধতা এবং বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকার কারণে পূর্ণাঙ্গ নজরদারি সম্ভব হচ্ছে না। ফলে মিয়ানমার ও উপকূলীয় রুট হয়ে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক বরিশালে পৌঁছাচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিতভাবে মাদক বাহক ও খুচরা বিক্রেতাদের গ্রেফতার করলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। ফলে মাদক ব্যবসার মূল নেটওয়ার্ক ভাঙা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, “পুলিশ, নৌ পুলিশ ও কোস্ট গার্ডের সমন্বয়ে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স।” তিনি জানান, মাদক কারবারিদের অবৈধ সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখতে মানি লন্ডারিং আইনের আওতায় তদন্ত চলছে।
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ-এর কমিশনার বলেন, “মাদক নির্মূলে শুধু পুলিশের অভিযান যথেষ্ট নয়। রাজনৈতিক, সামাজিক ও পারিবারিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মাদকবিরোধী অভিযান জোরদারের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সংগঠন ও সামাজিক নেতৃবৃন্দকে সম্পৃক্ত করে সচেতনতা ও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারলে বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলে মাদকের বিস্তার ঠেকানো কঠিন হবে।