রাসেল,বরিশাল প্রতিনিধি: বরিশাল নগর ও আশপাশের উপজেলায় ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দিন-রাতে মিলিয়ে ১০ থেকে ১১ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরবাসী। ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে রাতে চুরি-ছিনতাইয়ের মতো অপরাধের আশঙ্কা বাড়ার পাশাপাশি পানি সরবরাহ, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও দৈনন্দিন কার্যক্রমেও ব্যাপক প্রভাব পড়ছে।
দায়িত্বশীল সূত্রের তথ্যমতে, বরিশাল নগর ও সংলগ্ন উপজেলাগুলোতে প্রধানত রূপাতলী ও কলাডেমা গ্রিড স্টেশনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। রূপাতলী গ্রিড স্টেশনে পিক আওয়ারে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১১০ মেগাওয়াট। তবে রোববার বিকেল ৩টায় জাতীয় গ্রিড থেকে সেখানে সরবরাহ পাওয়া যায় মাত্র ৩৮ মেগাওয়াট। ফলে চাহিদার তুলনায় ঘাটতি ছিল ৭২ মেগাওয়াট।
এই ঘাটতি সামাল দিতে রূপাতলী স্টেশনের আওতাধীন বিভিন্ন ফিডারে প্রতি ঘণ্টা পরপর গড়ে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অন্যদিকে, কলাডেমা স্টেশনে পিক আওয়ারে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৩৫ মেগাওয়াট। রোববার দুপুরে সেখানে সরবরাহ ছিল ৬০ মেগাওয়াটের কিছু বেশি। ফলে এই স্টেশনেও প্রায় ৭৫ মেগাওয়াট ঘাটতি দেখা দেয়। এতে ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে রাজি হননি ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো)-এর দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, জাতীয় গ্রিড থেকে যেভাবে বিদ্যুৎ পাওয়া যায়, সেভাবেই স্থানীয় পর্যায়ে সরবরাহ করা হচ্ছে। চাহিদার তুলনায় কম বিদ্যুৎ পাওয়ার বিষয়টি ঢাকায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষই ভালো বলতে পারবে।
ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। নগরীর সদর রোডের তৈরি পোশাক বিক্রির প্রতিষ্ঠান নেক্সট প্লাসের মালিক ওয়াজেদ হোসেন চৌধুরী বলেন, সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ১০ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় পাঁচ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকে না।
তিনি বলেন, প্রথম দিকে জেনারেটর চালিয়ে ব্যবসা চালানোর চেষ্টা করলেও এখন শুধু জেনারেটরের তেল বাবদ মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকলে এসি চালানো যায় না, ফলে গরমের কারণে ক্রেতারাও দোকানে থাকতে চান না।
বরিশাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের প্রেসিডেন্ট এবায়েদুল হক চান বলেন, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে সব ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কার্যত অচল হয়ে পড়ছে। ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশ ব্যাংকঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করেন। তাদের নিয়মিত ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধ করতে হয়। এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে অনেক ব্যবসায়ী বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়বেন।
লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়েছে বরিশাল নগরীর পানি সরবরাহ ব্যবস্থায়। নগরীতে প্রতিদিন পানির চাহিদা প্রায় ৭ কোটি ২০ লাখ লিটার। কিন্তু বিদ্যুৎ সংকটের কারণে একটি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট ও ৩৮টি উৎপাদক পাম্পের মাধ্যমে বর্তমানে প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ লিটার পানি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের পানি সরবরাহ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ওমর ফারুক বলেন, স্বাভাবিক নিয়মে এখন পাম্পগুলো চালানো যাচ্ছে না। সাধারণ সময়ে একটানা পাম্প চালিয়ে রিজার্ভার পূর্ণ করা হয়। কিন্তু অনবরত লোডশেডিংয়ের কারণে এখন বিরতি দিয়ে পাম্প চালিয়ে রিজার্ভার পূর্ণ করতে হচ্ছে। এতে পাম্প স্টেশনগুলোর কর্মীরাও নানা জটিলতার মুখে পড়ছেন।
বিদ্যুৎ সংকটে শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগের কথাও তুলে ধরেছেন বরিশাল বিভাগ উন্নয়ন ও স্বার্থ সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক ডা. মিজানুর রহমান।
তিনি বলেন, মানুষের জীবনযাপনের প্রায় সবকিছুর সঙ্গে বিদ্যুৎ জড়িয়ে আছে। বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রার প্রায় সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে গরমের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। রাতে তাপমাত্রা ২৮ থেকে ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলেও বিদ্যুৎ না থাকায় পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
তিনি বিদ্যুৎ পরিস্থিতির দ্রুত উন্নয়নে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
ঘন ঘন ও দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিংয়ের কারণে বরিশালে শুধু বিদ্যুৎ নয়, এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পানি সরবরাহ, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও নগরজীবনের বিভিন্ন কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। দ্রুত সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে জনদুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
https://slotbet.online/