শরতের নীল আকাশ, মিঠে রোদ আর দিগন্তজোড়া জলরাশির বুকে ফুটে থাকা হাজারো লাল শাপলা। দেখে মনে হয়, সবুজের ক্যানভাসে প্রকৃতি নিজ হাতে এঁকেছে লাল রঙের ছবি। ভোরের আলোয় সাতলার বিল যেন হয়ে ওঠে কবিতার পঙ্ক্তি—‘জলের বুকে লাল শাপলা, চারপাশে সবুজের মেলা।’
বরিশালের উজিরপুর উপজেলার সাতলা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ জলাভূমির এই দৃশ্যে মুগ্ধ হয়ে প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন প্রকৃতিপ্রেমী ও দর্শনার্থীরা।
ইউনিয়নের সাতলা, উত্তর সাতলা, পূর্ব সাতলা, মুড়িবাড়ি, পটিবাড়ি ও আলামদি গ্রামের বিলজুড়ে লাল শাপলার সমারোহ দেখা যায়। ভোরের সূর্যের আলো পানিতে পড়তেই অপূর্ব এক রূপ নিয়ে ফুটে ওঠে শাপলার সৌন্দর্য। বরিশাল শহর থেকে সড়কপথে সাতলার বিলের দূরত্ব প্রায় ৫৫ কিলোমিটার। বর্ষা ও শরৎ মৌসুমে এই বিলটি হয়ে ওঠে প্রকৃতির এক অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি।
বরিশাল কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল (নথুল্লাবাদ) থেকে উজিরপুর বা সরাসরি সাতলা যাওয়ার লোকাল বাস কিংবা থ্রি-হুইলার পাওয়া যায়। এছাড়া নিজস্ব গাড়ি বা মোটরসাইকেলেও সড়কপথে খুব সহজেই পৌঁছানো সম্ভব। বরিশাল থেকে উজিরপুর হয়ে সাতলা পৌঁছাতে সাধারণত দেড় থেকে দুই ঘণ্টা সময় লাগে। বিলের পাড়ে পৌঁছানোর পর স্থানীয়দের কাছ থেকে ছোট ডিঙি নৌকা ভাড়া নিয়ে ঘুরে বেড়ানো যায় বিলের ভেতরে।
ছোট ডিঙি নৌকায় চড়ে বিলের বুক চিরে এগিয়ে চলার সময় দুপাশে শাপলার সারি দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। নৌকার বৈঠার ছলাৎছল শব্দের সঙ্গে শাপলার দোল খাওয়া দৃশ্য যেন প্রকৃতির নিজস্ব এক সংগীত।
ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে সাতলার বিল দেখতে আসা পর্যটক সাইফুল ইসলাম বলেন,
“ছবিতে সাতলার শাপলার বিল দেখেছি; কিন্তু এর সৌন্দর্য যে এতটা অসাধারণ, তা এখানে না এলে বুঝতাম না। চারদিকে শুধু শাপলা আর শাপলা। মনে হচ্ছে রূপকথার কোনো রাজ্যে চলে এসেছি। তবে নৌকা ভাড়া কিছুটা বেশি।”
বরিশাল শহর থেকে আসা দর্শনার্থী তানজিলা আক্তার জানান,
“সকালে নৌকায় করে বিলের মধ্যে ঘুরেছি। পানির ওপর লাল শাপলা, চারদিকে সবুজ আর মাথার ওপর নীল আকাশ—সব মিলিয়ে অসাধারণ লাগছে। এমন পরিবেশে এলে শহরের ব্যস্ততা ও ক্লান্তি মুহূর্তেই ভুলে যাওয়া যায়।”
আরেক দর্শনার্থী রাকিব হাসান বলেন,
“সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাতলার শাপলার অনেক ছবি দেখেছি। তাই বন্ধুদের নিয়ে দেখতে এসেছি। বাস্তবে এর সৌন্দর্য আরও বেশি। পর্যটকদের জন্য ভালো ঘাট, বসার জায়গা, নিরাপত্তার ব্যবস্থা ও পর্যাপ্ত নৌকার ব্যবস্থা করা হলে এখানে আরও বেশি মানুষ আসবেন।”
প্রতি বছর জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বিলে শাপলা ফুটলেও আগস্ট থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত এর সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি উপভোগ করা যায়। ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত শাপলা সতেজ ও পুরোপুরি প্রস্ফুটিত থাকে। তাই সূর্য ওঠার আগেই অনেক দর্শনার্থী বিলের পাড়ে ভিড় জমান।
স্থানীয় নৌকার মাঝি আবদুল কাদের বলেন,
“শাপলা ফুটলে আমাদের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে। নৌকায় করে তাদের বিল ঘুরিয়ে দেখাই। এই কয়েক মাস আমাদের বাড়তি আয় হয়।”
সাতলার বিলের শাপলা স্থানীয় মানুষের জীবিকার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। অনেকেই বিল থেকে শাপলা সংগ্রহ করে স্থানীয় হাট-বাজারে বিক্রি করেন। জাতীয় ফুল শাপলা শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, এটি স্থানীয় মানুষের খাদ্য ও আয়ের একটি অন্যতম প্রধান উৎস। প্রবীণদের ভাষ্য অনুযায়ী, বহু বছর ধরে সাতলার জলাভূমিতে লাল, নীল ও সাদা শাপলা ফুটে আসছে, যার মধ্যে লাল শাপলার আধিক্যই সবচেয়ে বেশি।
সাতলার শাপলার বিলকে ঘিরে বিশাল পর্যটন সম্ভাবনা রয়েছে। দর্শনার্থীদের নৌকায় ওঠানামার জন্য ঘাট, অবকাশযাপনের জন্য বাংলো, রাস্তাঘাট সংস্কার ও শৌচাগার নির্মাণসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক উদ্যোগের দাবি দীর্ঘদিনের।
উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আলী সুজা বলেন,
“সাতলার লাল শাপলার বিল উজিরপুরের অন্যতম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের স্থান। এর সৌন্দর্য আমাকে বিমোহিত করেছে। দর্শনার্থীদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সরকারি বরাদ্দ পাওয়া সাপেক্ষে পর্যটনকেন্দ্রটির আরও উন্নয়ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।”
বরিশালের অন্যতম জনপ্রিয় এই দর্শনীয় স্থানটি একবার ঘুরে দেখলে আপনার ভ্রমণতালিকার সেরা একটি অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে। ছুটির দিনে পরিবার বা বন্ধুদের নিয়ে ঘুরে আসুন সাতলার লাল শাপলার বিল থেকে।
https://slotbet.online/