বরিশাল বিভাগজুড়ে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। চলতি বছরে বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৩ হাজার ৫৬৭ জনে পৌঁছেছে। এর মধ্যে শুধু জুলাই মাসের প্রথম ২৬ দিনেই আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৪৫০ জন। একই সময়ে ডেঙ্গুতে প্রাণ হারিয়েছেন পাঁচজন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার (২৫ জুলাই) রাতে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঝালকাঠি সদর উপজেলার পোনাবালী গ্রামের রূপালী আক্তার (২৬) মারা যান। এর আগের দিন ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার মুন্নি আক্তার (৩৫) মারা যান। চলতি বছরে বিভাগে মোট পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ডেঙ্গু আক্রান্তের দিক থেকে সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে পিরোজপুর ও ঝালকাঠি জেলা। পিরোজপুরে এ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৬ জন এবং ঝালকাঠিতে ৯২২ জন। মৃত পাঁচজনের সবাই এই দুই জেলার বাসিন্দা।
এ ছাড়া বরিশাল জেলায় ৪৫৭ জন, পটুয়াখালীতে ৪১০ জন, বরগুনায় ৪০৬ জন এবং ভোলায় ১৩১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে ২৪০ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৩ হাজার ৩২২ জন।
রোববার শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, চলতি বছরে সেখানে ১৪৫ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের অধিকাংশই পিরোজপুর ও ঝালকাঠি জেলার বাসিন্দা। হাসপাতালটিতে ডেঙ্গুতে চারজনের মৃত্যু হয়েছে।
ডেঙ্গু আক্রান্তদের স্বজনদের অভিযোগ, রোগী বাড়লেও অনেক এলাকায় মশক নিধন কার্যক্রম ও জনসচেতনতামূলক প্রচারণা কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। পাশাপাশি সরকারি হাসপাতালগুলোতেও ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড না থাকায় সাধারণ রোগীদের সঙ্গে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
পিরোজপুরের নেছারাবাদের বাসিন্দা হালিমা খাতুন বলেন, “বছরের পর বছর ডেঙ্গু হচ্ছে, কিন্তু আমাদের এলাকায় নিয়মিত মশার ওষুধ ছিটাতে দেখি না।”
ঝালকাঠির দেলোয়ার হোসেন বলেন, “বৃষ্টির পর বিভিন্ন জায়গায় পানি জমে থাকছে। কিন্তু সেগুলো পরিষ্কার বা মশা নিধনে কার্যকর ব্যবস্থা চোখে পড়ছে না।”
বরগুনার বেতাগীর বাসিন্দা মনির হোসেনও নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম জোরদারের দাবি জানান।
শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. আব্দুল মুনায়েম সাদ বলেন, বর্ষাকালে প্রতি বছরই ডেঙ্গু রোগী বাড়ে। হাসপাতালের মেডিসিন ইউনিট চারটি থেকে বাড়িয়ে ছয়টি করা হয়েছে এবং প্রতিটি ওয়ার্ডে ডেঙ্গু কর্নার চালু করা হয়েছে। তবে রোগীর সংখ্যা আরও বাড়লে চাপ বৃদ্ধি পাবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. লোকমান হাকিম বলেন, বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার বংশবিস্তার হচ্ছে। ফলে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বেড়েছে। তিনি বলেন, মশা নিধনের দায়িত্ব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও স্থানীয় প্রশাসনকে আরও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জমে থাকা পানি অপসারণ, নিয়মিত মশক নিধন, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা না গেলে বরিশাল বিভাগে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।