নিজেস্ব প্রতিবেদক: মায়ের ভালোবাসা নিঃস্বার্থ, নির্মল ও চিরন্তন। সন্তানের সুখের জন্য নিজের স্বপ্ন, ইচ্ছা ও আরাম-আয়েশ বিসর্জন দিতে পারেন একজন মা। অথচ সেই সন্তানরাই যখন প্রতিষ্ঠিত হয়ে নিজেদের সুখের খোঁজে মাকে ভুলে যান, তখন জীবনের শেষ বয়সে অনেক মায়ের ঠাঁই হয় বৃদ্ধাশ্রমের চার দেয়ালের মাঝে। বরিশালের ঊষা রাণীর জীবনকাহিনী তেমনই এক হৃদয়স্পর্শী বাস্তবতা।
বরিশাল-এর এই বৃদ্ধা চার সন্তানের জননী। সারাজীবন মানুষের বাড়িতে কাজ করে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিয়েছেন, মানুষ করেছেন। নিজের কষ্ট-দুঃখকে আড়াল করে সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়তেই কেটে গেছে তার জীবন। কিন্তু বয়সের ভারে যখন তার প্রয়োজন ছিল একটু আশ্রয়, যত্ন ও ভালোবাসা, তখনই একে একে সব সন্তানের ঘরের দরজা তার জন্য বন্ধ হয়ে যায়।
ঊষা রাণী জানান, নদীভাঙনে তাদের বাড়িঘর ও ভিটেমাটি বিলীন হয়ে যায়। এরপর তিনি বড় ছেলের কাছে আশ্রয়ের জন্য পা ধরে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু তাতেও মন গলেনি। ছোট ছেলেও স্ত্রীর কথায় তাকে ঘর থেকে নামিয়ে দেয়। অন্য ছেলের পরিবার আশ্রয় দিতে রাজি হয়নি। একমাত্র মেয়ের বাড়িতেও ঠাঁই হয়নি; মেয়ে-জামাই তাকে ফিরিয়ে দেন। এক সন্তানের দরজা থেকে আরেক সন্তানের দরজায় ঘুরেও কোথাও আশ্রয় মেলেনি তার।
শেষ পর্যন্ত নিকট আত্মীয়ের সহায়তায় বয়স্ক পুনর্বাসন কল্যাণ সংস্থা পরিচালিত বৃদ্ধাশ্রম-এ আশ্রয় পান তিনি। বর্তমানে কাউনিয়া এলাকায় অবস্থিত এই বৃদ্ধাশ্রমেই তার দিন কাটছে। সন্তানদের অবহেলার কষ্ট বুকে নিয়েও আশ্রমে তিনবেলা খাবার পেয়ে তিনি তুলনামূলক শান্তিতে আছেন।
তবে এত অবহেলা, কষ্ট ও অপমানের পরও সন্তানদের প্রতি তার কোনো ক্ষোভ নেই। আজও তিনি সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করেন, তার কোনো সন্তানের যেন কোনো ক্ষতি না হয়। তারা যেন সুখে-শান্তিতে থাকে—এটাই তার একমাত্র কামনা।
বৃদ্ধাশ্রমের আরেক নিবাসী শেফালী বেগমের গল্পও কম বেদনাদায়ক নয়। অল্প বয়সে বিয়ে, স্বল্প বয়সেই স্বামীহারা হওয়া, দিনমজুরের কাজ করে একমাত্র ছেলেকে বড় করা—সবকিছুর পরও বার্ধক্যে তার প্রাপ্য হয়েছে অবহেলা ও মারধর।
শুধু ঊষা রাণী বা শেফালী বেগম নন, বৃদ্ধাশ্রমের প্রায় প্রতিটি মায়ের বুকেই জমে আছে অবহেলা, কষ্ট আর না-পাওয়ার দীর্ঘ গল্প। যে বয়সে নাতি-নাতনিদের সঙ্গে আনন্দে সময় কাটানোর কথা, সেই বয়সে তারা কাটাচ্ছেন নিঃসঙ্গতা আর নীরবতায়। তবুও তারা সন্তানদের জন্য অভিশাপ নয়, বরং সাফল্য ও সুস্থতার দোয়া করেন।
বয়স্ক পুনর্বাসন কল্যাণ সংস্থা-এর প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক মো. শাখাওয়াত হোসেন জানান, একসময় ১৩০ শয্যার বৃদ্ধাশ্রম পরিচালিত হলেও অর্থসংকট ও সহযোগিতা কমে যাওয়ায় বর্তমানে ভাড়া বাসায় ৬০ শয্যার একটি আশ্রমে ৬০ জন মা আশ্রয় নিয়েছেন। অর্থের অভাবে প্রতিষ্ঠানটিও এখন টিকে থাকার লড়াই করছে।
তিনি বলেন, “মা-বাবা একসময় সন্তানের কাছে বোঝা হয়ে যান। অথচ তাদের যত্ন নেওয়া প্রতিটি সন্তানের নৈতিক দায়িত্ব। মা-বাবা চলে গেলে আর কখনো ফিরে পাওয়া যায় না।”
ঊষা রাণী ও শেফালী বেগমের জীবনগাথা আমাদের সামনে এক গভীর প্রশ্ন রেখে যায়—আমরা কি সত্যিই আমাদের মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব পালন করছি, নাকি কেবল বিশেষ দিনগুলোতে শুভেচ্ছা জানিয়ে কর্তব্য শেষ করছি?