বরিশাল সদর উপজেলা বিএনপির সদ্য ঘোষিত ১৬১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘিরে দলটির অভ্যন্তরীণ বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। কমিটিতে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি, মৃত ব্যক্তি, দীর্ঘদিনের শয্যাশায়ী এবং প্রবাসীদের পদ দেওয়া ও সাংগঠনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করার অভিযোগ তুলেছেন দলের একাংশের নেতারা। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে বরিশাল বিএনপির দীর্ঘদিনের গ্রুপিংও আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
দলীয় সূত্র জানায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন চলাকালে কেন্দ্রীয় বিএনপি বরিশাল সদর উপজেলা বিএনপির তিন সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করে। পরে গত ১২ জুলাই সাবেক জামায়াত নেতা নুরুল ইসলামকে আহ্বায়ক, সাইফুল ইসলাম আব্বাসকে সদস্য সচিব এবং সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম রাঢ়ীকে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক করে ১৬১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়। কমিটি ঘোষণার পর থেকেই এর গঠনপ্রক্রিয়া ও বৈধতা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। এ নিয়ে সংবাদ সম্মেলন, ঝাড়ু মিছিল এবং প্রকাশ্য প্রতিবাদও হয়েছে।
নবগঠিত কমিটির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুস সালাম রাঢ়ী ও সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক জিয়াউর ইসলাম সাবুর অভিযোগ, আহ্বায়ক কমিটির অন্য সদস্যদের সঙ্গে কোনো আলোচনা বা অনুমোদন ছাড়াই আহ্বায়ক নুরুল ইসলাম এককভাবে পূর্ণাঙ্গ কমিটির তালিকা কেন্দ্রে পাঠিয়েছেন। তাদের দাবি, কমিটিতে এমন কয়েকজনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যারা অতীতে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন এবং বিভিন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করেছেন।
পদবঞ্চিত নেতাদের অভিযোগ, কমিটির কয়েকজন সদস্য বর্তমানে প্রবাসে অবস্থান করছেন। এছাড়া ১০৭ নম্বর সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত মিজানুর রহমান আয়নাল বেপারী দীর্ঘদিন আগে মারা গেছেন এবং প্রায় আট বছর ধরে অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী থাকা ডা. মো. ফরিদ উদ্দিন তালুকদারকেও সদস্য করা হয়েছে। তাদের ভাষ্য, এসব অন্তর্ভুক্তি কমিটি প্রণয়নে যথাযথ যাচাই-বাছাই না হওয়ার প্রমাণ।
নুরুল ইসলামকে নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন দলের একাংশের নেতারা। তাদের দাবি, তিনি অতীতে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং এখনো জামায়াত-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন। তবে এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
এদিকে বরিশাল দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবুল কালাম শাহীন বলেন, উপজেলা কমিটি গঠনের বিষয়ে জেলা কমিটিকে অবহিত বা সম্পৃক্ত করা হয়নি। তিনি বলেন, নিয়ম অনুযায়ী জেলা কমিটির সঙ্গে আলোচনা হওয়ার কথা থাকলেও কেন্দ্র থেকে সরাসরি কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির বরিশাল বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন বলেন, কমিটি গঠনে সাংগঠনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা উচিত ছিল। তার ভাষায়, অভিভাবক হিসেবে সবাইকে নিয়ে বসে কমিটি করা প্রয়োজন ছিল। বিতর্ক এড়াতে সাংগঠনিক নিয়মের মধ্যেই বিষয়টি হওয়া উচিত ছিল।
তবে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও বরিশাল সদর আসনের সংসদ সদস্য মজিবর রহমান সরোয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, কমিটি গঠনের বিষয়ে তিনি অবগত ছিলেন না এবং কারা কমিটিতে রয়েছেন, সেটিও বিস্তারিত দেখেননি। তার দাবি, কমিটিতে ত্রুটি থাকতে পারে। তবে ক্ষুব্ধ নেতারা মানববন্ধন বা আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি তার কাছে উত্থাপন করতে পারতেন। ঝাড়ু মিছিলকে তিনি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও মন্তব্য করেন।
স্থানীয় নেতাদের ভাষ্য, বরিশাল বিএনপিতে দীর্ঘদিন ধরে একাধিক গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এসব গ্রুপের মধ্যে আপাত ঐক্য দেখা গেলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে সেই বিভক্তি আবার প্রকাশ্যে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান কমিটি নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ ভবিষ্যতে দলীয় রাজনীতিতে নতুন সংকট তৈরি করতে পারে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় বিএনপিই নেবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট নেতারা।
https://slotbet.online/