বরিশাল ও বিশ্বকাপ ঘিরে সর্বশেষ আপডেট পড়ুন এখনই।

তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে ভার্চুয়াল দুনিয়া দিন দিন নারীদের জন্য উদ্বেগ ও আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফেক আইডি খুলে ছবি বিকৃত করা, আপত্তিকর বার্তা পাঠানো, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য ও চরিত্রহননের মতো নানা ধরনের সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন নারীরা। বিশেষ করে তরুণীদের মধ্যে এ সমস্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।
বেসরকারি সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সাইবার বুলিংয়ের শিকার হওয়া নারীদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের বয়স ১৬ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। গত তিন বছরে সাইবার বুলিংয়ের কারণে অন্তত চার নারী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন বলেও জানা গেছে।
বরিশাল সরকারি মহিলা কলেজের অনার্স চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী তানজিন সিফা বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বাধীনভাবে একটি ছবি পোস্ট করার পরিবেশও নেই। ফেক আইডি খুলে ছবি বিকৃত করে ব্ল্যাকমেইল করা এখন নিত্যদিনের ঘটনা। আমরা মেয়েরা প্রতিনিয়ত মানসিক চাপে থাকি।”
বরিশাল কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী সানজিদা বলেন, “অপরিচিত আইডি থেকে আপত্তিকর প্রস্তাব আসা এখন নিয়মিত ঘটনা। প্রতিবাদ করতে গেলেও অনেক সময় উল্টো বুলিংয়ের শিকার হতে হয়। সাইবার অপরাধীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।”
সরকারি বিএম কলেজের শিক্ষার্থী সুমি হক জানান, পরিচিত কিংবা অপরিচিত ব্যক্তিরা ফেক আইডি তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চরিত্রহননের চেষ্টা করে। লোকলজ্জার ভয়ে অনেকেই বিষয়গুলো প্রকাশ করেন না, যা পরবর্তীতে মানসিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
নারীদের সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে কাজ করছে জাতীয় মহিলা সংস্থা। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ড. ফারহানা আইরিছ বলেন, “সাইবার বুলিংয়ের শিকার নারীদের বড় একটি অংশ তরুণী। শুধু সচেতনতা নয়, নারীদের নিজেদের আইনি অধিকার সম্পর্কেও জানতে হবে এবং যেকোনো ধরনের অনলাইন হয়রানির বিরুদ্ধে শুরুতেই ব্যবস্থা নিতে হবে।”
আদালত সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বরিশাল সাইবার ট্রাইব্যুনালে ৫৩৬টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ১৮০টি সাইবার ট্রাইব্যুনাল মামলা, ৩৪৭টি পিটিশন মামলা এবং ৯টি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) রয়েছে। এছাড়া উচ্চ আদালতের নির্দেশে ১০টি মামলার বিচার কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে।
বেসরকারি সংস্থা আঁচল ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, গত তিন বছরে বরিশাল বিভাগে সাইবার বুলিংয়ের কারণে অন্তত চার নারী আত্মহত্যা করেছেন। এর মধ্যে ২০২৩ সালে বরগুনার তালতলীতে মেয়ের আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় এক মা আত্মহত্যা করেন। এছাড়া ২০২৫ সালে দুই নারী শিক্ষার্থী এবং চলতি বছরের ১৫ জুন পিরোজপুরের জিয়ানগরে সপ্তম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রী ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর আত্মহত্যা করেন।
এমন পরিস্থিতিতে নারীদের জন্য জেলাভিত্তিক বিশেষ সেল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে বিভাগীয় প্রশাসন। বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার খলিলুর রহমান বলেন, “সাইবার অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে প্রশাসন তৎপর রয়েছে। নারীদের তাৎক্ষণিক আইনি ও মানসিক সহায়তা দিতে জেলাভিত্তিক বিশেষ সেল গঠনের কাজ চলছে। একই সঙ্গে অভিভাবকদেরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।”
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশাসন এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে সাইবার অপরাধ দমনে কঠোর আইন প্রয়োগ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।
এই খবর সম্পর্কে আপনার মতামত নিচে কমেন্ট করুন এবং শেয়ার করুন।