জিহাদ রানা: গভীর রাতে ফেসবুক মেসেঞ্জার বা হোয়াটসঅ্যাপে পরিচিত কারও কাছ থেকে হঠাৎ বার্তা আসে—“খুব বিপদে আছি, জরুরি কিছু টাকা দরকার, সকালে ফিরিয়ে দেব।” মানবিক কারণে অনেকে টাকা পাঠিয়ে দিলেও পরে দেখা যায়, সেই অর্থের বড় একটি অংশ চলে গেছে অনলাইন জুয়ার অ্যাকাউন্টে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইন জুয়া শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ নয়; এটি সামাজিক, পারিবারিক ও মানসিক সংকটেরও বড় উৎসে পরিণত হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অনলাইন বেটিং ও ক্যাসিনোভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিপুলসংখ্যক তরুণ প্রতিদিন ঝুঁকিপূর্ণ অর্থনৈতিক খেলায় অংশ নিচ্ছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বন্ধু বা পরিচিত কারও মাধ্যমে তরুণরা অনলাইন বেটিংয়ে যুক্ত হন। শুরুতে অল্প কিছু অর্থ জিতে যাওয়ায় সহজে টাকা আয়ের মোহ তৈরি হয়। কিন্তু ধীরে ধীরে তারা বড় অঙ্কের বাজিতে জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশায় আরও বেশি অর্থ বিনিয়োগ করতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন।
সরকারি ব্রজমোহন কলেজ-এর এক শিক্ষার্থী জানান, বন্ধুর মাধ্যমে অনলাইন বেটিংয়ে যুক্ত হয়ে তিনি প্রায় ৫০ হাজার টাকা হারিয়েছেন।
তার ভাষায়, “শুরুতে মনে হয়েছিল ভাগ্য আমার পক্ষে। কয়েকবার জেতার পর বিষয়টিকে সহজ আয়ের মাধ্যম মনে হয়েছিল। কিন্তু পরে বুঝেছি, এটি এমন একটি ফাঁদ, যেখান থেকে বের হওয়া খুব কঠিন।”
অন্যদিকে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়-এর এক শিক্ষার্থী জানান, পরিবার থেকে অতিরিক্ত টাকা এনে নিয়মিত অনলাইন বেটিং করতেন। কয়েকটি ম্যাচে জয়ের পর বড় অঙ্কের বাজি ধরতে শুরু করেন। পরে ধারাবাহিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়েন।
তিনি বলেন,“প্রতিবার হারার পর মনে হয়েছে পরেরবার জিতব। কিন্তু সেই আশাই আমাকে আরও ডুবিয়েছে। জুয়ার টাকা কখনো স্থায়ী হয় না।”
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অনেকেই প্রতিদিন এক হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বাজি ধরছেন। সাময়িকভাবে কেউ কেউ লাভবান হলেও দীর্ঘমেয়াদে অধিকাংশই বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।
জুয়ার অর্থ জোগাতে গিয়ে অনেকে ঋণ নিচ্ছেন, ব্যক্তিগত সম্পদ বিক্রি করছেন। এমনকি প্রতারণা, চুরি কিংবা আর্থিক জালিয়াতির মতো অপরাধেও জড়িয়ে পড়ার ঘটনাও ঘটছে।
মনোবিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদদের মতে, অনলাইন জুয়ার প্রভাব শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘসময় স্ক্রিনের সামনে থাকা, জেতা-হারার উত্তেজনা, ঋণের চাপ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা অনেককে হতাশা, উদ্বেগ, অনিদ্রা ও আচরণগত সমস্যার দিকে ঠেলে দেয়।
শিক্ষাবিদ ও সংগঠক অধ্যাপক টুনু রাণী কর্মকার বলেন,
“মাদকের মতো অনলাইন জুয়াও তরুণ সমাজকে গভীরভাবে আক্রান্ত করছে। অনেক পরিবার অর্থনৈতিক ও মানসিক সংকটে পড়ছে। শুধু আইন প্রয়োগ নয়, পরিবারকেও সন্তানের ডিজিটাল কর্মকাণ্ডের দিকে নজর দিতে হবে।”
বাংলাদেশে অনলাইন জুয়া আইনত নিষিদ্ধ। তবে বিদেশি সার্ভার ব্যবহার করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চক্র এখনও তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
মো. আব্দুল হান্নান বলেন,“অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত চক্র এবং আসক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন জুয়ার সাইট শনাক্ত ও বন্ধের কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এটি একটি সামাজিক ব্যাধি এবং এর প্রতিরোধে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইন জুয়ার ভয়াবহতা থেকে তরুণ সমাজকে রক্ষা করতে পরিবারকে আরও সচেতন হতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যথায় সহজ আয়ের মোহে পড়ে একটি বড় প্রজন্ম অর্থনৈতিক ও মানসিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।
হেড অফিস: ৩৯ দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা।
মোবাইল : ০১৭৪২-২৮০৪৯৮, মেইল: dailybarishalsangbad@gmail.com
© 2026 বরিশাল সংবাদ | Barisal Sangbad