


বরিশাল প্রতিনিধি: নির্বাচনের আগে গঠিত ইসলামপন্থী দলগুলোর জোট ভেঙে যাওয়ায় বরিশাল বিভাগে বড় ধরনের রাজনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। বিশেষ করে চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন নির্বাচনি ঐক্য থেকে সরে দাঁড়ানোর পর বরিশাল বিভাগের অন্তত পাঁচটি আসনে পরাজিত হয়েছে জামায়াত। পাশাপাশি আরও ছয়টি আসনে দুই দলের সম্মিলিত শক্তি থাকলে জয়ের খুব কাছাকাছি পৌঁছে যেত তারা—এমন তথ্য উঠে এসেছে জাতীয় নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণে।
এই ফলাফল ঘিরে বরিশালে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে তীব্র আলোচনা। স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের মতে, পারস্পরিক অনৈক্যই বরিশাল অঞ্চলে জামায়াতের ‘বড় ধরনের ভরাডুবি’র প্রধান কারণ। একই সঙ্গে ঐক্য ভাঙার খেসারত দিতে হয়েছে ইসলামী আন্দোলনকেও। সারা দেশে দলটি পেয়েছে মাত্র একটি আসন। এমনকি দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারাও নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন। অথচ জামায়াতের সঙ্গে জোট অটুট থাকলে শুধু বরিশাল অঞ্চলেই কমপক্ষে চারজন সংসদ সদস্য পেতে পারত হাতপাখা প্রতীকের দলটি।
বরিশাল বিভাগের ২১টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১৮টিতে জয় পেয়েছে বিএনপি ও বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীরা। জামায়াতে ইসলামী জয়ী হয়েছে দুটি আসনে এবং ইসলামী আন্দোলন পেয়েছে মাত্র একটি আসন। অথচ নির্বাচনের আগে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনসহ ১১ দল নিয়ে যে জোট গঠিত হয়েছিল, সেটি টিকে থাকলে এই চিত্র পুরোপুরি পাল্টে যেতে পারত। ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, সেক্ষেত্রে শুধু বরিশাল বিভাগেই এই দুই দলের ঝুলিতে অন্তত ৮ থেকে ১০টি আসন যাওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা ছিল। আরও অন্তত ছয়টি আসনে ধানের শীষের সঙ্গে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান নেমে আসত মাত্র ৩ থেকে ৫ হাজার ভোটে।
বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ–মুলাদী) আসনে বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদিন জয়ী হয়েছেন ৭৮ হাজার ১৩১ ভোট পেয়ে। এখানে জামায়াত জোটের প্রার্থী এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ পেয়েছেন ৫৭ হাজার ১৪৯ ভোট এবং ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী সিরাজুল ইসলাম পেয়েছেন ২১ হাজার ৭২৪ ভোট। ঐক্য থাকলে এই দুই প্রার্থীর সম্মিলিত ভোট দাঁড়াত ৭৮ হাজার ৮৭৩—যা বিএনপির প্রার্থীর চেয়ে বেশি।
বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসনেও একই চিত্র। এখানে বিএনপির আবুল হোসেন খান পেয়েছেন ৮১ হাজার ৮৭ ভোট। বিপরীতে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের দুই প্রার্থীর মিলিত ভোট ছিল ৮৩ হাজার ৬২৮। জোট অটুট থাকলে এই আসনেও পাল্টে যেতে পারত ফলাফল।
বরগুনা-২ (বামনা–পাথরঘাটা–বেতাগী) আসনে হাতপাখা ও দাঁড়িপাল্লার সম্মিলিত ভোট ছিল ১ লাখ ১ হাজার ৭১০। সেখানে বিএনপির নুরুল ইসলাম মনি জয়ী হয়েছেন ৯০ হাজার ৬৪৩ ভোটে। পিরোজপুর-৩ (মঠবাড়িয়া) আসনে জামায়াত প্রার্থী না দিয়ে এনসিপির ড. শামিম হামিদিকে সমর্থন দেয়। এখানে শাপলা কলি ও হাতপাখার মোট ভোট দাঁড়ায় ৭১ হাজার ৮৭৯, আর বিএনপির প্রার্থী রুহুল আমিন দুলাল জয়ী হন ৬৩ হাজার ৭৯১ ভোটে।
বরিশাল-৫ (সদর) আসনে বিএনপির মজিবর রহমান সরোয়ার পেয়েছেন ১ লাখ ৩৫ হাজার ৬ ভোট। ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী, দলের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম পেয়েছেন ৯৫ হাজার ৮ ভোট। চরমোনাই পীরের প্রতি সম্মান জানিয়ে এই আসনে জামায়াত প্রার্থী দেয়নি। একই সঙ্গে জামায়াতের ভোটাররাও হাতপাখায় ভোট দেননি। নির্বাচনের আগে ও পরে জামায়াতের বিরুদ্ধে ইসলামী আন্দোলনের নেতাদের ধারাবাহিক সমালোচনার প্রভাবেই এই দূরত্ব তৈরি হয় বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। ঐক্য থাকলে এই আসনে ফল ভিন্ন হতে পারত বলেও মত তাঁদের।
শুধু নিশ্চিত জয় হাতছাড়া নয়—জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের ঐক্য ভেঙে যাওয়ায় বহু আসনে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের পরাজয়ের ব্যবধানও বেড়েছে। যেমন পিরোজপুর-২ (ভান্ডারিয়া–কাউখালী–নেসারাবাদ) আসনে বিএনপির আহম্মেদ সোহেল মঞ্জুর সুমন পেয়েছেন ১ লাখ ৫ হাজার ১৮৫ ভোট। জামায়াতের শামিম সাঈদী পেয়েছেন ৯৬ হাজার ৮৯৭ এবং ইসলামী আন্দোলনের আবুল কালাম আজাদ পেয়েছেন ৬ হাজার ৬৯৭ ভোট। এই দুই দলের ভোট যোগ হলে ব্যবধান নেমে আসত মাত্র এক থেকে দেড় হাজারে।
এ ধরনের আরও অন্তত পাঁচটি আসনে দাঁড়িপাল্লা ও হাতপাখার ভোট এক হলে বিএনপির জয় হতো অত্যন্ত হাড্ডাহাড্ডি।
বরিশাল অঞ্চল ইসলামী আন্দোলনের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। কারণ এখানকার চরমোনাই ইউনিয়ন থেকেই দলটির জন্ম, এখানেই প্রতিষ্ঠাতার দরবার। ফলে প্রতিটি আসনেই দলটির শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো ও জনসমর্থন রয়েছে। রাজনৈতিক সচেতন মহলের মতে, এই শক্তিকে একত্রিত করতে না পারাই জামায়াতের বড় ব্যর্থতা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-৫ (সদর) ও বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ)—উভয় আসনেই পরাজিত হয়েছেন মুফতি ফয়জুল করীম। বরিশাল-৫ আসনে তিনি পেয়েছেন ৯৩ হাজার ৫২৮ ভোট, বিপরীতে বিএনপির মজিবর রহমান সরোয়ার পেয়েছেন ১ লাখ ৩১ হাজার ৪৩১ ভোট। বরিশাল-৬ আসনে বিএনপির আবুল হোসেন খান পেয়েছেন ৮২ হাজার ২১৭ ভোট, সেখানে ফয়জুল করীমের প্রাপ্ত ভোট ২৯ হাজার ১৪৬।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকেরা বলছেন, নির্বাচনি ঐক্য অটুট থাকলে বরিশাল বিভাগে জামায়াত–চরমোনাই জোট অন্তত ৮–১০টি আসন পেতে পারত। কিন্তু অনৈক্যের কারণে একদিকে বড় ধরনের আসন হারিয়েছে জামায়াত, অন্যদিকে মাত্র একটি আসনে জয় নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে।