
নিজেস্ব প্রতিবেদক: ছুটির দিনের দুপুরে সাতক্ষীরার কাছে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল দেশ, যা অনুভূত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গেও। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ দপ্তর ইউএসজিএস বলছে, শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) বেলা ১টা ৫২ মিনিটে এ ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৩। এর আগে গত দুই দিনও দেশের বিভিন্ন স্থানে কম্পন অনুভূত হয়। টানা এমন ভূকম্পন ছড়িয়েছে আতঙ্ক। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্পগুলোর উৎপত্তিস্থল ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় হওয়ায় আতঙ্কের বিশেষ কারণ নেই।আবহাওয়া অফিস বলছে, চলতি মাসের প্রথম ২৭ দিনেই ১১ বার কেঁপে উঠেছে বাংলাদেশের ভূমি। এগুলোর বেশিরভাগ উৎপত্তি আশপাশ অঞ্চলে হলেও অভ্যন্তরে কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে।দেশে গত ২ দিন ভূমিকম্প টের পাওয়া গেলেও উৎপত্তিস্থল ছিল দেশের বাইরে। গত বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা ৪ মিনিটে অনুভূত ৪ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ভারতের সিকিম। এর আগের দিন রাতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুভূত হয় ৫ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প। এর উৎপত্তি ছিল প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের মাওলাইক এলাকায়।তবে শুক্রবার ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা সাতক্ষীরার আশাশুনি ও এর সংলগ্ন এলাকায়। সাতক্ষীরা জেলা সদর থেকে ওই এলাকা ২৯ দশমিক ৪ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণ পূর্বে। আর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের টাকি থেকে ২৬ দশমিক ২ কিলোমিটার দক্ষিণ পূর্বে। ভয়ের বিষয়-এর কেন্দ্র ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ৯ দশমিক ৮ কিলোমিটার গভীরে। এতে কেন্দ্র থেকে ১৮৮ কিলোমিটার দূরে থাকলেও রাজধানীতে ভালো ঝাঁকুনি অনুভূত হয়। যেসময় কাঁপুনি শুরু হয়, তখন অনেক মসজিদে জুমার নামাজ চলছিল। বাসায় যারা ছিলেন, তারাও অনেকে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় অনেকেই ভয়ে বাসাবাড়ি থেকে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন। পশ্চিমবঙ্গেও বেশ ভালো কাঁপুনি অনুভূত হওয়ার কথা জানিয়ে এনডিটিভি লিখেছে, কলকাতায় অনেকেই আতঙ্কে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন। তবে সেখানেও ক্ষয়ক্ষতির কোনো তথ্য মেলেনি। এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার জানান, কয়েক মিনিটের ব্যবধানে আজ দুইবার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। কম্পনটি হয়েছে ইন্ডিয়ান প্লেটে। তবে এতে ভয় নেই জানিয়ে এই ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ বলেন, আমাদের জন্য ভয়ের কারণ হতো ভূমিকম্পটা চট্টগ্রামের দিকে হলে। গত বুধ ও বৃহস্পতিবার যে দুটি ভূমিকম্প হয়েছে সেগুলোর দেশের বাইরে দুটি ভিন্ন অঞ্চলে। একেকটা একেক প্লেটে হয়েছে। অধ্যাপক ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক যে অবস্থান সেখানে ভূমিকম্প হওয়াটাই স্বাভাবিক ঘটনা। ভূমিকম্প না হওয়াটা ভয়ের। দীর্ঘদিন শক্তি জমার পর ভূমিকম্প হলে মাত্রা বেশি হয়, তাতে ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। আরকিছু দিন পরপর ভূমিকম্প হলে শক্তি জমে বড় মাত্রার কম্পন সৃষ্টি হতে পারে না। তবে সব সময় সচেতন থাকার পরামর্শ দেন তিনি। ভূমিকম্পের সময় কীভাবে এক-দুই কদমের মধ্যে নিজেকে নিরাপদ স্থলে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে সেটার মহড়া দেওয়ার পরামর্শও দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন ভূঁঞা বলেন, ‘পৃথিবীতে প্রতিদিন অন্তত অর্ধশতাধিক ভূমিকম্প হয়। তবে এগুলোর অনেকগুলোই আমরা টের পাই না বা অনুভব হয় না। তবে এই ছোট কম্পনগুলো একেকটা বড় ভূমিকম্পের বার্তা।’ এই ভূতত্ত্ববিদ আরও বলেন, ‘মূলত যেখানে একবার ভূমিকম্প হয়, সেখানেই আবার ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। কারণ সেখানে শক্তি জমা আছে বলে ধরে নেওয়া হয়। এই বিবেচনায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাও চিহ্নিত করা হয়। সে হিসেবে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব সিলেট অঞ্চল থেকে দক্ষিণের কক্সবাজার তথা চট্টগ্রাম অঞ্চল ভূমিকম্পের জন্য ব্যাপক ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ এই অঞ্চলে অতীতে বড়মাত্রা ভূমিকম্পের রেকর্ড রয়েছে। এই অঞ্চলের মাটির নীচে যে পরিমাণ শক্তি জমায়িত রয়েছে তাতে শক্তিশালী ভূমিকম্প হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছুই নয়। এটি যখন তখনই ঘটতে পারে।’ভূমিকম্পের প্রস্তুতি সম্পর্কে এই অধ্যাপক বলেন, ‘আমাদের ভূমিকম্প সংঘটিত হওয়ার পূর্বে ও পরে এবং ভূমিকম্প সংঘটিত হওয়ার সময়ের প্রস্তুতি অনিবার্যভাবে আমাদের নিতে হবে। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যবইয়ে আবশ্যিকভাবে ভূমিকম্পের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কারণ আমরা এমন একটি জায়গায় বসবাস করি যেখানে ভূমিকম্প ঘটবেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রকৌশল বিদ্যার একেবারে সর্বোচ্চ ব্যবহার বিধি মেনে এগুলো পুনর্নির্মাণ করতে হবে। এখন প্রশ্ন আসতে পারে আমরা গরিব দেশ। তাহলে প্রতিদিন যে উইপোকার মতো হাজার হাজার বিল্ডিং হচ্ছে। ২০ তলা। ১৫ তলা। ১৭ তলা-এগুলো কী মাগনা হচ্ছে? এখানে টাকা নেই? আমি প্রতিনিয়ত বিল্ডিং তৈরি করছি উইপোকার ডিবির মতো এবং বিল্ডিং কোর্ড না মেনেই করছি। আমি দশ কোটি টাকা দিয়ে একটা ইমরারত তৈরি করলাম। আর ১১ কোটি দিয়ে যদি একটা ভূমিকম্প সহায়ক করি তাহলে আমার কী ক্ষতি হলো? এটা বাধ্য করতে হবে মানুষকে। সচেতনতা তৈরি করতে হবে প্রতিটি পরিবারের ভেতর থেকে।’ চলতি মাসে ১১ বার ভূমিকম্প চলতি মাসের শুরু দিনই দুই বারবার ভূমিকম্প আঘাত হানে। প্রথমটি ওইদিন ভোর ৪টা ৩২ মিনিটি ৩২ সেকেন্ডে ঘটেছিল। সেটি ঢাকা থেকে ২০৮ কিলোমিটার দূরে উৎপত্তি হয়েছিল; এটি সিলেট শহর থেকে পূর্ব-দক্ষিণ-পূর্বের এলাকায় উৎপত্তি হয়েছিল। রিখটার স্কেলে যার মাত্রা ছিল ৩.০। আবার একই দিন সন্ধ্যায় ৬টা ৩০ মিনিটি ২৬ সেকেন্ডে আরেকটি ভূমিকম্প হয়। এটি ঢাকা থেকে মাত্র ৪২ কিলোমিটার দূরে উৎপত্তি হয়েছিল। রিখটার স্কেলে যার মাত্রা ছিল ৩.২। এরপর ৩ ফেব্রুয়ারি এসে আবার দুই দফায় ভূমিকম্পে কেঁপে উঠে দেশ। ওইদিন রাত ৯টা ৩৪ মিনিটি ০১ সেকেন্ডে পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমারে ৫.৯ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। যা ঢাকা থেকে ৫২১ কিলোমিটারে দূরে ছিল। তবে মাঝারি ধরণেই ওই ভূমিকম্প চট্টগ্রাম অঞ্চলে অনুভূত হয়েছিল। তবে একই দিন আরেকটি ভূমিকম্প হলেও সেটি ছিল ৪.১ মাত্রার। স্বল্পমাত্রার ওই ভূমিকম্পটি উৎপত্তি হয়েছিল ঢাকা থেকে ১৭৫ কিলোমিটার দূরে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের ডাটা অনুযায়ী, পরবর্তীতে ৯ ফেব্রুয়ারি (৩.৩ মাত্রা, ঢাকা থেকে ২২১ কিলোমিটার দূরে), ১০ ফেব্রুয়ারি (৪.০ মাত্রা, ঢাকা থেকে ২১৪ কিলোমিটার দূরে), ১৯ ফেব্রুয়ারি (৪.১ মাত্রা, ঢাকা থেকে ১৮৭ কিলোমিটার দূরে), ২০ ফেব্রুয়ারি (৩.৬ মাত্রা, ঢাকা থেকে ১২৮ কিলোমিটার দূরে), ২৩ ফেব্রুয়ারি (৪.৪ মাত্রা, ঢাকা থেকে ২৫২ কিলোমিটার দূরে) ও ২৫ ফেব্রুয়ারি (৫.১ মাত্রা, ঢাকা থেকে ৪৬২ কিলোমিটার দূরে) বাংলাদেশ ও আশপাশ অঞ্চলে ভূমিকম্প হয়েছিল। গত জানুয়ারিতেও ভূমিকম্পে কয়েকবার কেঁপেছে দেশ। এর আগে ডিসেম্বরেও ভূমিকম্প হয়েছে। বিশেষ করে গত নভেম্বরে ঢাকার অদূরে নরসিংদীর ঘোড়াশালে এক সপ্তাহে চার দফায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছিল। এরমধ্যে গত ২১ নভেম্বর সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে ঘোড়াশাল এলাকায় ৫.৭ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প অনুভূত হয়, যার কেন্দ্রস্থল ভূপৃষ্ঠের ১০ কিমি গভীরে ছিল। ওই ভূমিকম্পে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ব্যাপকভাবে কম্পন অনুভূত হয়। ওই ভূকম্পনে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে ভবন হেলে পড়ে। অনেক ভবনে ফাটল দেখা দেয়। কয়েকজন নিহত হওয়ার পাশাপাশি বেশ কয়েকজন আহত হন।