বরিশাল মহাশ্মশানে শ্মশান দীপাবলি ২০২৬
নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল: বাংলাদেশের বরিশাল নগরীর কাউনিয়া এলাকায় অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী বরিশাল মহাশ্মশানে চলছে শ্মশান দীপাবলি উৎসবের প্রস্তুতি। আগামী ৭ নভেম্বর (শনিবার) ভূত চতুর্দশী উপলক্ষে মোমবাতি, প্রদীপ ও আলোকসজ্জায় আলোকিত হয়ে উঠবে প্রায় ২০০ বছরের প্রাচীন এই মহাশ্মশান। প্রয়াত স্বজনদের স্মরণ, তাঁদের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পালিত হবে ব্যতিক্রমী এই আয়োজন।
বরিশাল মহাশ্মশান এশিয়া উপমহাদেশের অন্যতম বৃহৎ শ্মশান হিসেবে পরিচিত। শুধু দাহকার্য সম্পন্ন করার স্থান নয়, ঐতিহাসিক স্থাপনা, অসংখ্য সমাধি মন্দির এবং দীর্ঘদিনের ধর্মীয় ঐতিহ্যের কারণে এটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। প্রতি বছর শ্মশান দীপাবলি উপলক্ষে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ এখানে সমবেত হন।
বরিশাল মহাশ্মশান: প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্য
বরিশাল নগরীর কাউনিয়া এলাকায় অবস্থিত এই মহাশ্মশান প্রায় দুই শতাব্দীর ইতিহাস ও ঐতিহ্য বহন করছে। মহাশ্মশানের প্রধান ফটকের পাশেই রয়েছে শ্মশানকালী মন্দির। পুরো শ্মশানজুড়ে রয়েছে প্রয়াত ব্যক্তিদের স্মরণে নির্মিত অসংখ্য পাকা ও কাঁচা সমাধি মন্দির।
স্থানীয়ভাবে প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, এখানে ৭০ হাজারেরও বেশি সমাধি মন্দির রয়েছে। এর মধ্যে ৬০ হাজারের বেশি পাকা সমাধি এবং প্রায় ১০ হাজার কাঁচা মঠ রয়েছে। পাশাপাশি এমন প্রায় ৮০০টি সমাধি রয়েছে, যেগুলোর দেখাশোনা করার মতো কোনো স্বজন বর্তমানে নেই। কিছু সমাধি শতাধিক বছরের পুরোনো।
বিভিন্ন নকশা ও আকৃতিতে নির্মিত এসব সমাধি বরিশাল মহাশ্মশানের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য তুলে ধরে।
ভূত চতুর্দশীতে কেন পালিত হয় শ্মশান দীপাবলি?
হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস ও ঐতিহ্য অনুযায়ী, ভূত চতুর্দশী তিথিতে প্রয়াত পূর্বপুরুষ ও স্বজনদের স্মরণ করা হয়। সেই বিশ্বাস থেকেই বরিশাল মহাশ্মশানে প্রতিবছর আয়োজন করা হয় শ্মশান দীপাবলি উৎসব।
১৯২৭ সাল থেকে বরিশাল মহাশ্মশানে এই দীপাবলি উৎসব পালিত হয়ে আসছে বলে প্রচলিত রয়েছে। এদিন সন্ধ্যার পর সমাধিগুলোতে মোমবাতি, প্রদীপ ও বিভিন্ন রঙের আলোকসজ্জা করা হয়। প্রয়াত স্বজনদের ছবি সমাধির সামনে রেখে তাঁদের প্রিয় খাবার নিবেদন করেন পরিবারের সদস্যরা। কোথাও ধর্মগ্রন্থ পাঠ, কোথাও কীর্তন, আবার কোথাও চলে পূজা-অর্চনা ও প্রার্থনা।
গোধূলির আলো মিলিয়ে যাওয়ার পর হাজার হাজার প্রদীপ ও মোমবাতির আলোয় পুরো মহাশ্মশান এক অনন্য রূপ ধারণ করে। সমাধি থেকে সমাধিতে ছড়িয়ে পড়ে আলোর মায়াবী আভা। ধূপের সুবাস, উলুধ্বনি, প্রার্থনা ও কীর্তনের সুরে সৃষ্টি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ।
প্রিয়জনকে হারানোর বেদনার মধ্যেও এই আয়োজন হয়ে ওঠে ভালোবাসা, স্মৃতি, শ্রদ্ধা ও পারিবারিক বন্ধনের এক অনন্য প্রকাশ।
বরিশাল মহাশ্মশানে শ্মশান দীপাবলি ২০২৬-এর প্রস্তুতি
বরিশাল মহাশ্মশান রক্ষা কমিটির সভাপতি অসীম কুমার দাস মুরলী ও সাধারণ সম্পাদক বিজয় ভক্ত জানিয়েছেন, এবার ৭ নভেম্বর, বাংলা ২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দে শ্মশান দীপাবলি অনুষ্ঠিত হবে। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিথি সারারাত থাকবে।
উৎসবকে ঘিরে মহাশ্মশানজুড়ে চলছে প্রস্তুতি। সমাধি মন্দির পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা, আলোকসজ্জা, পূজার আয়োজন এবং দর্শনার্থীদের উপস্থিতি সামাল দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
মহাশ্মশানের প্রধান ফটকের ডান পাশে অবস্থিত শ্মশানকালী মন্দিরে থাকবে বিশেষ পূজার আয়োজন। উলুধ্বনি ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে মুখরিত হয়ে উঠবে মন্দির প্রাঙ্গণ।
বরিশাল মহাশ্মশানে শায়িত ইতিহাসের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি
বরিশাল মহাশ্মশান শুধু ধর্মীয় ঐতিহ্যের জন্য নয়, ইতিহাসের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তির শেষ ঠিকানা হিসেবেও পরিচিত।
এখানে শায়িত রয়েছেন নারী আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত মনোরমা বসু (মাসিমা), তাঁর স্বামী সমাজকর্মী চিন্তাহরণ বসু, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সংগঠক দেবেন্দ্রনাথ ঘোষ, ভাষা আন্দোলনের সংগ্রামী ও নারী অধিকারকর্মী রানী ভট্টাচার্য, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতা হিরণলাল ভট্টাচার্য, শৈলেশ্বর চক্রবর্তী এবং বিপ্লবী প্রাণ কুমার সেন।
এ ছাড়া কবি জীবনানন্দ দাশের পিতামহ সর্বানন্দ দাশ ও পিতা সত্যানন্দ দাশসহ ইতিহাসের আরও অনেক পরিচিত ও অপরিচিত ব্যক্তির স্মৃতিবিজড়িত সমাধি রয়েছে এই মহাশ্মশানে।
শোক, স্মৃতি ও আলোর এক অনন্য উৎসব
সাধারণত শ্মশানঘাট মানেই স্বজন হারানোর বেদনা, কান্না আর বিদায়ের স্মৃতি। কিন্তু বরিশাল মহাশ্মশানের শ্মশান দীপাবলি সেই পরিচিত পরিবেশকে ভিন্ন মাত্রা দেয়।
এদিন প্রতিটি সমাধি যেন হয়ে ওঠে স্মৃতির একেকটি প্রদীপ। কোথাও সন্তান মা-বাবার স্মৃতিতে প্রদীপ জ্বালান, কোথাও স্বামী-স্ত্রী প্রয়াত জীবনসঙ্গীর সমাধির সামনে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। কেউ প্রিয়জনের ছবি সামনে রেখে প্রার্থনা করেন, কেউ চোখের জল মুছে ফিরে যান স্মৃতির কাছে।
আলো, ধূপের সুবাস, প্রার্থনা আর মানুষের ভালোবাসায় বরিশাল মহাশ্মশান হয়ে ওঠে এক ব্যতিক্রমী মিলনস্থল। মৃত্যু যে মানুষের স্মৃতি ও ভালোবাসাকে মুছে দিতে পারে না, শ্মশান দীপাবলির প্রতিটি প্রদীপ যেন সেই কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।
বরিশাল মহাশ্মশানের এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজন তাই শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি পূর্বপুরুষের প্রতি শ্রদ্ধা, ইতিহাসের সংরক্ষণ এবং প্রিয়জনদের স্মরণ করার এক অনন্য সাংস্কৃতিক আয়োজন।
প্রতিবেদন: বরিশাল সংবাদ
[web_stories title="false" excerpt="false" author="false" date="false" archive_link="true" archive_link_label="" circle_size="150" sharp_corners="false" image_alignment="left" number_of_columns="1" number_of_stories="5" order="DESC" orderby="post_title" view="circles" /]