দীর্ঘ চার বছর ধরে দ্বন্দ্ব-সংঘাতে জর্জরিত বরিশাল মহানগর বিএনপিতে অবশেষে দেখা দিয়েছে ঐক্যের সুর। মহানগর বিএনপির সভাপতি পদ থেকে মজিবর রহমান সরোয়ারকে সরিয়ে দেওয়া এবং তাঁর বিরোধীদের নিয়ে আহ্বায়ক কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া সেই দ্বন্দ্ব এখন ইতিহাস। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-৫ (সদর) আসনে সরোয়ারের দলীয় মনোনয়ন ঘোষণার পর তাঁর বিরোধী পক্ষসহ সব নেতাকর্মী এখন এককাট্টা।
বৃহস্পতিবার দুপুরে বরিশাল সদর রোডের অশ্বিনী কুমার হলে জেলা ও মহানগর বিএনপি, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের যৌথ সভায় এই ঐক্যের চিত্র স্পষ্ট হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বরিশাল মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান খান। উপস্থিত ছিলেন মহানগরের সদস্যসচিব জিয়া উদ্দিন সিকদার, জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আবুল কালাম, সদর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক নুরুল আমীন, মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি নুরুল আলমসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।
সভাস্থলে সকাল থেকেই ওয়ার্ড ও ইউনিটের নেতা-কর্মীরা মিছিল নিয়ে সমবেত হন। ‘ধানের শীষের বিজয় চাই’, ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’—এসব স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে সদর রোড এলাকা।
বক্তারা বলেন, বরিশাল-৫ আসনে যিনি দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন, তাঁকে নিয়েই এখন সবার ঐক্য। দলের ভেতরে আর কোনো বিভেদ নেই—সবাই এক লক্ষ্যেই কাজ করছেন, ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিত করা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপি প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার বলেন, “দেশের মানুষ গত ১৬ বছর ভোট দিতে পারেনি। আজ তারা ভোটাধিকার ফিরে পেতে মুখিয়ে আছে। ধানের শীষ শুধু একটি প্রতীক নয়, এটি জনগণের অধিকার ও স্বাধীনতার প্রতীক। গণতন্ত্রবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে জনগণের ঐক্যবদ্ধ শক্তিই এবার জবাব দেবে।” তিনি আরও বলেন, “বরিশাল বিএনপি সবসময় আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিল। এবারও ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে থেকে ধানের শীষের পক্ষে ভোটের ঢেউ তুলতে হবে ঘরে ঘরে।”
দলীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালের ৩ নভেম্বর মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় বিএনপি। এতে তৎকালীন সভাপতি মজিবর রহমান সরোয়ারকে বাদ দিয়ে মনিরুজ্জামান খান ফারুককে আহ্বায়ক এবং মীর জাহিদুল কবিরকে সদস্যসচিব করা হয়। পরের বছর ২২ জানুয়ারি ৪১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে সরোয়ারের অনুসারী নেতারা বাদ পড়েন, যার ফলে নগরের ৩০টি ওয়ার্ড কমিটি বিলুপ্ত হয়। এতে বিভাজন তীব্র আকার ধারণ করে।
গত বছর ২৩ জুন মহানগর বিএনপির সেই কমিটি বিলুপ্ত করে নতুন করে মনিরুজ্জামান খানকে আহ্বায়ক ও জিয়া উদ্দিন সিকদারকে সদস্যসচিব করে ৪২ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি দেয় কেন্দ্র। ওই কমিটিতে অনেক নেতা বাদ পড়েন, যারা পরবর্তীতে সরোয়ারের অনুসারী হয়ে আলাদা কর্মসূচি পালন করেন।
সম্প্রতি অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে কয়েকটি হামলা ও হেনস্তার ঘটনাও ঘটে। তবে মজিবর রহমান সরোয়ার আবারও দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পর বরিশাল বিএনপিতে স্বস্তি ও ঐক্যের আবহ ফিরে এসেছে।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র, একাধিকবার সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের সাবেক হুইপ মজিবর রহমান সরোয়ার প্রায় দুই দশক মহানগর বিএনপির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
নগর বিএনপির সাবেক সহসাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল হক তারিন বলেন, “মজিবর রহমান সবসময় বরিশালে ঐক্যবদ্ধ বিএনপি চেয়েছেন। এবার মনোনয়ন পাওয়ার পর তিনি সবাইকে নিয়েই কাজ শুরু করেছেন। বৃহস্পতিবারের সভা প্রমাণ করেছে—বরিশাল বিএনপি এখন ঐক্যবদ্ধ।”