বরিশাল সংবাদ ডেস্ক: আজ বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের (বিএমপি) প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। প্রতিষ্ঠার দুই দশক পেরিয়ে গেলেও জনবল, যানবাহন ও অবকাঠামোগত নানা সংকটের মধ্যে দায়িত্ব পালন করছে এ মহানগর পুলিশ ইউনিট। অনুমোদিত ২ হাজার ১৩৫টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন প্রায় ১ হাজার ৮৫০ জন। গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য থাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ দমন ও নগরীর যানবাহন নিয়ন্ত্রণে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে বিএমপিকে।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে মহানগর পুলিশের কার্যক্রম ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে জনবল ও যানবাহন সংকট। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে বিএমপি থেকে তিনজন উপ-পুলিশ কমিশনারকে বদলি করা হলেও তাঁদের পদে নতুন কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
বিএমপির সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী, দুইজন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনারের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। আটজন উপ-পুলিশ কমিশনারের বিপরীতে কর্মরত আছেন তিনজন। ১১টি অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার পদের বিপরীতে রয়েছেন চারজন। এ ছাড়া ১৭টি সহকারী পুলিশ কমিশনার পদের অর্ধেকেরও বেশি শূন্য বলে জানা গেছে।
শুধু ঊর্ধ্বতন পদেই নয়, পরিদর্শক, উপপরিদর্শক (এসআই), ট্রাফিক সার্জেন্ট ও কনস্টেবলসহ বিভিন্ন পদেও জনবলের ঘাটতি রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, অনুমোদিত কাঠামো অনুযায়ী প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় পুলিশের নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ছে।
জনসংখ্যা ও যানবাহনের সংখ্যা বাড়লেও সে অনুযায়ী পুলিশি সক্ষমতা বাড়েনি। বিশেষ করে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় জনবল ও সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। নগরীর বিভিন্ন সড়কে অবৈধ রিকশা, ইজিবাইক ও অন্যান্য যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে ট্রাফিক পুলিশকে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে যানজট নিয়ন্ত্রণেও।
গত দুই দশকে বিএমপি সদর দপ্তর, পুলিশ লাইনস ও এয়ারপোর্ট থানা ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। সম্প্রতি বন্দর থানা ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। কোতোয়ালি থানার নতুন ভবনের কাজ চলতি অর্থবছরে শুরুর কথা থাকলেও কাউনিয়া থানা ভবন নির্মাণের প্রকল্প এখনো অনুমোদন পায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে পুলিশ কমিশনারের জন্য নতুন বাসভবন নির্মাণের উদ্যোগও বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমানে বরিশাল জেলা পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের জরাজীর্ণ বাসভবনে ডিআইজি পদমর্যাদার বিএমপি কমিশনারকে বসবাস করতে হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নগরীর বিস্তৃতি ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে পুলিশি সেবার পরিধি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, বিএমপির বর্তমান চারটি থানার পাশাপাশি আরও অন্তত তিনটি থানা স্থাপনের বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
প্রস্তাবিত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে রূপাতলী-কালিজিয়া ও জাগুয়া এলাকা, নবগ্রাম রোড-চৌমহনী থেকে কড়াপুর পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকা এবং চরমোনাই ইউনিয়ন ও আশপাশের অঞ্চল। এসব এলাকায় নতুন থানা স্থাপন এবং বিদ্যমান থানার কার্যক্রম বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে পুলিশি সেবা আরও সহজলভ্য করা সম্ভব বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল।
বিএমপির প্রতিষ্ঠাকালীন অনুমোদিত জনবল ছিল প্রায় সাড়ে ১২শ। পরে তা ২ হাজার ৭৩ জনে উন্নীত হয়। বর্তমানে অনুমোদিত জনবল ২ হাজার ১৩৫ জন। ২০১৮ সালে মহানগরীতে আরও চারটি পুলিশ স্টেশন ও কয়েকটি ফাঁড়ি স্থাপনসহ জনবল প্রায় ৪ হাজার ৩০০ জনে উন্নীত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে আট বছরেও সেই প্রস্তাব অনুমোদন পায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
জনবল ও যানবাহনের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও অপরাধ দমনে অভিযান অব্যাহত রেখেছে বিএমপি। অপরাধ পর্যবেক্ষকদের মতে, নগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
পুলিশের কার্যক্রম সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নগরীর বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত ব্লক রেইড ও মাদকবিরোধী অভিযান চালানো হচ্ছে। কেডিসি বস্তিসহ মাদক কারবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে চিহ্নিত কয়েকটি এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
গত ১ আগস্ট থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত বিএমপি সহস্রাধিক সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও বিভিন্ন মামলার আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে বলে জানা গেছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে মাদক মামলার আসামিরাও রয়েছেন।
গত আগস্টের প্রথম সপ্তাহে বিএমপির ২২তম কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেন আবু রায়হান মো. সালেহ। তিনি বলেন, সংকট ও সমস্যা থাকবেই। তবে এর মধ্যেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে নিরন্তর চেষ্টা চলছে এবং অনেক ক্ষেত্রে সফলতাও এসেছে। মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।
নগরীর যানবাহন নিয়ন্ত্রণ এখন বিএমপির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। অভিযোগ রয়েছে, অবৈধ যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও সেগুলো নিয়ন্ত্রণে নগর প্রশাসন ও ট্রাফিক পুলিশের মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। হাইড্রোলিক হর্নের ব্যবহার এবং মাহিন্দ্রা-আলফাসহ বিভিন্ন থ্রি-হুইলারের বেপরোয়া চলাচল নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
এসব যানবাহনের অনেক চালকের বৈধ লাইসেন্স নেই বলেও অভিযোগ উঠেছে। ফলে সড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করছেন নগরবাসী। তাঁদের মতে, ট্রাফিক আইন প্রয়োগের পাশাপাশি যানবাহনের নিবন্ধন, চালকের লাইসেন্স এবং নগরীর সড়ক ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বিএমপির গত দুই দশকের কার্যক্রমে অবকাঠামো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও জনসচেতনতার ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর প্রায় ১৫ দিন পুলিশের কার্যক্রম স্থবির থাকলেও নগরীতে বড় ধরনের আইনশৃঙ্খলা সংকট তৈরি হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে গ্রহণযোগ্য সম্পর্ক বজায় থাকার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।
বিএমপি কমিশনার আবু রায়হান মো. সালেহ বলেন, দেশের অন্যান্য এলাকার তুলনায় বরিশাল নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো। জনবান্ধব পুলিশ ইউনিট গড়ে তুলতে তাঁরা চেষ্টা করছেন। তাঁর ভাষ্য, নগরবাসী যেন দিন-রাত নির্বিঘ্নে ও নির্ভয়ে চলাচল করতে পারেন, সে লক্ষ্যে পুলিশ কাজ করছে।
রোজা, ঈদ, পূজা, বড়দিন ও কোরবানির পশুর হাটসহ বিভিন্ন উৎসব নির্বিঘ্নে পরিচালনার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। উৎসবের আগে নাগরিকদের মতামত নিয়ে এবং তাঁদের সম্পৃক্ত করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও উন্নয়নের চেষ্টা চলছে বলে জানান কমিশনার। তাঁর দাবি, সম্প্রতি দুর্গাপূজাও নির্বিঘ্নে ও স্বাচ্ছন্দ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিএমপির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অনুমোদিত পদে জনবল নিয়োগ, পর্যাপ্ত যানবাহন সরবরাহ, নতুন থানা স্থাপনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা। এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলে নগরবাসীর নিরাপত্তা ও পুলিশি সেবা আরও জোরদার হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
হেড অফিস: ৩৯ দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা।
মোবাইল : ০১৭৪২-২৮০৪৯৮, মেইল: dailybarishalsangbad@gmail.com
© 2026 বরিশাল সংবাদ | Barisal Sangbad