স্টাফ রিপোর্টার | বরিশাল
স্ত্রীর কবরের পাশে গিয়ে নীরবে বসে থাকেন মোহাম্মদ শরীফ। পাশে খেলছে ছয় মাসের ছেলে, যে কোনোদিন তার মায়ের মুখ দেখবে না। সেই শূন্যতা বুকে নিয়েই দিন কাটছে তার।
শরীফের দাবি, ভোলার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধন হেলথ কেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসকদের অবহেলা ও ভুল রক্ত দেওয়ার কারণেই স্ত্রী লামিয়ার মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু ঘটনার কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও প্রতিষ্ঠানটি আগের মতোই চলছে। বিচার না পাওয়ার আশঙ্কায় তিনি মামলাও করেননি।
শুধু লামিয়ার মৃত্যু নয়, বরিশাল বিভাগে চিকিৎসা অবহেলা, ভুল চিকিৎসা, দালালচক্রের প্রতারণা এবং অনিয়মে পরিচালিত বেসরকারি ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে অভিযোগ যেন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। একের পর এক মৃত্যুর অভিযোগ উঠলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা বা বিচার হচ্ছে না বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
মোহাম্মদ শরীফ জানান, গত ৭ জানুয়ারি স্ত্রী লামিয়াকে সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য ভর্তি করা হয়। ৮ জানুয়ারি পুত্রসন্তানের জন্ম হয়। অপারেশনের পর ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ ‘ও’ পজিটিভ রক্তের প্রয়োজন বলে জানায়। পরিবার দ্রুত রক্তের ব্যবস্থা করলেও সেটি ক্রসম্যাচ ছাড়াই রোগীর শরীরে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
তিনি বলেন, "আমরা আপত্তি জানিয়েছিলাম। কিন্তু বলা হয়েছিল কোনো সমস্যা হবে না। কিছুক্ষণের মধ্যেই স্ত্রীর শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। পরে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা জানান, ভুল রক্ত দেওয়ায় রক্তকণিকা নষ্ট হয়ে গেছে। ১২ জানুয়ারি আমার স্ত্রী মারা যান।"
তার ভাষায়, "ক্লিনিকটি এখনও চলছে। শুধু আমার সংসারটাই আর নেই।"
গত কয়েক বছরে বরিশাল বিভাগে চিকিৎসা অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার অভিযোগে একাধিক মৃত্যুর ঘটনা সামনে এসেছে।
২০২৫ সালের ৯ এপ্রিল পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় চিকিৎসকের অবহেলায় প্রসূতি তামান্না বেগমের মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে। ২০২৪ সালের ১৬ জানুয়ারি বাবুগঞ্জের হালিমা-মান্নান মেমোরিয়াল ক্লিনিকে ভুল চিকিৎসার শিকার হন গৌরনদীর রাজীব খলিফা। ২০২৩ সালের ১ আগস্ট বরিশাল নগরীর রাহাত-আনোয়ার হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় ছয় মাস বয়সী শিশু তানজিম ইসলামের মৃত্যুর অভিযোগও রয়েছে।
সম্প্রতি নগরীর কেএমসি হাসপাতালে চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগে যুবদল নেতা মনির খানের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে স্বজনদের সঙ্গে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সংঘর্ষের ঘটনাও জনমনে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল নগরীতে অনুমোদিত ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে ১৩৮টি এবং নিবন্ধিত বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতাল রয়েছে ৪৩টি।
তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি, বাস্তবে দুই শতাধিক ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান যথাযথ নিবন্ধন, জনবল কিংবা প্রয়োজনীয় মানদণ্ড পূরণ না করেই রোগী দেখছে।
গত ২৮ এপ্রিল জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসংলগ্ন আটটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অভিযান চালায়।
অভিযানে মেয়াদোত্তীর্ণ কিট ব্যবহার, প্রয়োজনীয় অনুমোদন না থাকা এবং পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার আগেই রিপোর্ট প্রস্তুতের মতো গুরুতর অনিয়ম ধরা পড়ে। আটটি প্রতিষ্ঠানকে মোট ২ লাখ ৮৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, জরিমানা দিয়েই তারা আগের মতো কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
আরও চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, অবৈধ ক্লিনিকের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকা বরিশাল ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কেএম শহিদুল্লাহর নিজস্ব ইসলামিয়া ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টার ছয় বছর ধরে লাইসেন্স ছাড়া পরিচালিত হওয়ার তথ্যও ওই অভিযানে উঠে আসে।
সরকারি হাসপাতালের সামনেই সক্রিয় দালালচক্র।
বানারীপাড়া থেকে চিকিৎসার জন্য আসা মমতাজ বেগম জানান, বাসস্ট্যান্ড থেকে এক রিকশাচালক তাদের সরকারি হাসপাতাল বন্ধ বলে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসক না দেখিয়েই রক্ত পরীক্ষার নামে আট হাজার টাকা নেওয়া হয়।
একটি বেসরকারি ক্লিনিকের সাবেক কর্মচারীর ভাষ্য, বৈধ-অবৈধ প্রায় সব ক্লিনিকেই দালাল রয়েছে। বাস টার্মিনাল, সরকারি হাসপাতাল ও শহরের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়ে তারা রোগী সংগ্রহ করে কমিশনের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট ক্লিনিকে পাঠায়।
এক থ্রি-হুইলার চালক জানান, শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সদর হাসপাতাল, বাটারগলি, বেলভিউ গলি ও বিবির পুকুরপাড় এলাকায় অন্তত দেড়শ দালাল সক্রিয়। রোগীপ্রতি কমিশন মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করা সম্ভব।
এমনকি বরিশাল জেনারেল হাসপাতালে অবস্থানরত একটি ক্লিনিকের কর্মী পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি বলেন, "আমরা রোস্টার করে হাসপাতালে থাকি। যে বেশি রোগী নিয়ে যেতে পারে, সে বেশি টাকা পায়।"
বরিশাল ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কেএম শহিদুল্লাহ বলেন, কিছু অসাধু মালিক ও দালালের কারণে পুরো খাতের বদনাম হচ্ছে। অবৈধ ক্লিনিকের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার দাবি জানান তিনি।
জেলা সিভিল সার্জন ডা. এস এম মনজুর-এ-এলাহী বলেন, অবৈধভাবে পরিচালিত ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ওপর নজরদারি রয়েছে। ভুল চিকিৎসার লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বরিশাল বিভাগের ভারপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. লোকমান হাকিম বলেন, বেসরকারি ক্লিনিকগুলোর মান নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য বিভাগ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। নিয়মিত অভিযান চলছে। শর্ত পূরণ করতে না পারলে কোনো প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়ন করা হবে না। দালালচক্রের বিরুদ্ধেও নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।
একের পর এক ভুল চিকিৎসার অভিযোগ, রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার দালালচক্র, অনুমোদনহীন বা অনিয়মে পরিচালিত ক্লিনিক এবং অভিযানে ধরা পড়ার পরও অনেক প্রতিষ্ঠানের বহাল তবিয়তে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া—এসব ঘটনায় বরিশালের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার কার্যকর তদারকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ভুক্তভোগীদের প্রত্যাশা, শুধু জরিমানা নয়, মানুষের জীবন নিয়ে অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক।
আরো পড়ুন-
★ শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের তালিকা ও অ্যাপয়েন্টমেন্ট গাইড (২০২৬)
হেড অফিস: ৩৯ দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা।
মোবাইল : ০১৭৪২-২৮০৪৯৮, মেইল: dailybarishalsangbad@gmail.com
© 2026 বরিশাল সংবাদ | Barisal Sangbad