বরিশাল নগরে মশার উপদ্রব ভয়াবহ আকার ধারণ করলেও কার্যকর মশক নিধন কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বাসিন্দারা। দুই বছরের ব্যবধানে মশা নিধনে -এর ব্যয় কয়েক লাখ টাকা থেকে বেড়ে ছয় কোটির ঘরে পৌঁছালেও বাস্তবে মশা কমার কোনো লক্ষণ দেখছেন না নগরবাসী। বরং দিন-রাত মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে অনেক পরিবারকে দিনের বেলাতেও কয়েল জ্বালিয়ে রাখতে হচ্ছে।
সিটি করপোরেশনের বাজেট ও ব্যয়ের হিসাব পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মশা নিধনে ব্যয় ছিল প্রায় ২১ লাখ টাকা। কিন্তু পরের অর্থবছরে একই খাতে ব্যয় দেখানো হয়েছে সাড়ে তিন কোটির বেশি। আর চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ছয় কোটি ৩০ লাখ টাকারও বেশি। অর্থাৎ মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে এই খাতে ব্যয় বেড়েছে প্রায় ২৯ গুণ।
এই অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে নগরজুড়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কাগজে-কলমে কোটি কোটি টাকার হিসাব দেখানো হলেও মাঠপর্যায়ে মশা নিধনের কার্যকর উদ্যোগ খুব কমই চোখে পড়ে। অনেক এলাকাবাসী জানিয়েছেন, নিয়মিত ফগিং বা ওষুধ ছিটানোর কার্যক্রম তারা দেখেননি। বরং কোথাও কোথাও মাঝে মধ্যে হাতে বহনযোগ্য স্প্রে মেশিন ব্যবহার করতে দেখা যায়।
নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখা গেছে, খোলা ড্রেন, জমে থাকা নোংরা পানি এবং অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে মশার বংশবিস্তার বাড়ছে। বিশেষ করে জলাবদ্ধ এলাকায় মশার লার্ভা ছড়িয়ে পড়েছে। সামনে বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ায় -র ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
সিটি করপোরেশনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শুধু মশা নিধনেই ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় অর্ধকোটি টাকা ব্যয় হয়েছে ফগার মেশিন কেনায়। তবে নগরবাসীর বড় অংশ বলছে, তারা কখনো সেই ফগার মেশিনের ব্যবহার দেখেননি।
বাজেট নথিতে আরও দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পরিচ্ছন্নতা খাতে মোট ব্যয় ছিল প্রায় ৩৬ লাখ টাকা। কিন্তু মাত্র এক বছরের ব্যবধানে একই খাতের ব্যয় কয়েক কোটি টাকায় পৌঁছে যায়। চলতি অর্থবছরেও মশা নিধন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিচ্ছন্নতা সামগ্রী কেনার জন্য বড় অঙ্কের বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
নগরবাসীর অভিযোগ, ব্যয় বাড়লেও মশার উপদ্রব কমানোর দৃশ্যমান কোনো ফল পাওয়া যাচ্ছে না। সন্ধ্যার পর অনেক এলাকায় বাইরে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে পড়ছে। শিশুদের মশারির ভেতরে রাখতে হচ্ছে, আবার দিনের বেলাতেও অনেক পরিবার কয়েল ব্যবহার করছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু ওষুধ ছিটালেই মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। জলাবদ্ধতা দূর করা, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ, ড্রেন পরিষ্কার এবং কার্যকর লার্ভিসাইড ব্যবস্থাপনা জরুরি। নিম্নমানের রাসায়নিক ব্যবহার করলে তাতে মশা নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, মশক নিধনের নামে অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে অর্থ অপচয় বা অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের দাবি থাকলেও নগরবাসী তার সুফল পাচ্ছে না। ফলে পুরো ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন।
-এর পরিচ্ছন্নতা শাখার একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তাও ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধিকে প্রশ্নবিদ্ধ বলে মন্তব্য করেছেন। তার ভাষ্য, কয়েক লাখ টাকা থেকে হঠাৎ কয়েক কোটি টাকায় ব্যয় পৌঁছানো স্বাভাবিক নয়। যদিও তিনি দাবি করেছেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি এবং মশার প্রকোপ বৃদ্ধির কারণেই এই খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে।
বর্তমান প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অধিকাংশ ব্যয় আগের প্রশাসনিক সময়ের। একই সঙ্গে মশা নিধনে ব্যবহৃত রাসায়নিকের কার্যকারিতা নিয়ে অভিযোগ পাওয়ায় ঠিকাদার পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও জনস্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের মতে, বর্ষা শুরুর আগে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে বরিশালে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। তাই শুধু বাজেট বাড়ানো নয়, বাস্তবমুখী ও জবাবদিহিমূলক মশক নিধন কার্যক্রম নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তারা।
হেড অফিস: ৩৯ দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা।
মোবাইল : ০১৭৪২-২৮০৪৯৮, মেইল: dailybarishalsangbad@gmail.com
© 2026 বরিশাল সংবাদ | Barisal Sangbad