বরিশাল প্রতিনিধি: রমজান মাসকে সামনে রেখে বরিশাল নগরীতে ভয়াবহ খাদ্য ভেজালের একটি চাঞ্চল্যকর চিত্র উঠে এসেছে। নগরীর ৬ নম্বর ওয়ার্ডের হাটখোলা মরিচ পট্টিতে অবস্থিত ‘বাবা লেচুশাহ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে মরিচের গুঁড়ার নামে ভেজাল পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দোকানের সামনের অংশ তালাবদ্ধ রেখে পেছনের দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে শ্রমিকরা নিয়মিতভাবে ভেজাল মরিচের গুঁড়া তৈরি করছেন। গত শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে পচা ও পোকাধরা চাল, ধানের তুষ, নারিকেলের শুকনো ছোবড়া, কৃত্রিম রং ও বিভিন্ন কেমিক্যাল ব্যবহার করে শুকনা মরিচ ছাড়াই মরিচের গুঁড়া প্রস্তুত করা হচ্ছে। গুদামে বিপুল পরিমাণ ভেজাল পণ্য মজুদ থাকতেও দেখা যায়।
অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় রাজনৈতিক সংগঠনের কিছু নেতাকর্মীর পাহারায় এই অবৈধ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। অনুসন্ধানী টিম ভিডিও ধারণের চেষ্টা করলে বাধা দেওয়া হয়। এ সময় ৬ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সদস্য সচিব এফ এম আলামিন প্রকাশ্যে স্বীকার করেন যে তারা ওই কারখানায় পাহারার দায়িত্ব পালন করেন এবং প্রতিদিন জনপ্রতি ৫০০ টাকা করে পারিশ্রমিক পান। তার ভাষ্যমতে, একদিনে প্রায় ২১৫ বস্তা মরিচের গুঁড়া উৎপাদন করা হয়।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত আরও একজন ব্যক্তি সংবাদকর্মীদের হুমকি দিয়ে বলেন, প্রয়োজনে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সংবাদ প্রকাশ বন্ধ করা হবে। একপর্যায়ে সেখানে উপস্থিত হন ৬ নম্বর ওয়ার্ড শ্রমিক দলের সভাপতি জসিম। তিনি সংবাদকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, ব্যবসাটি বন্ধ না করে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার ইঙ্গিত দেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান, প্রতিষ্ঠানটির মালিক মো. শামিম কয়েক বছর আগেও ফেরি করে চটপটি ও বাদাম বিক্রি করতেন। বর্তমানে ভেজাল হলুদ ও মরিচের ব্যবসার মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, তিনি হাটখোলা এলাকায় প্রায় ৪২ লাখ টাকা ব্যয়ে দুটি দোকান কিনেছেন। পাশাপাশি পলাশপুরের নুর নগর ও পিডিবি এলাকায় বহুতল ভবন নির্মাণ করে ভাড়া দিচ্ছেন এবং বিভিন্ন এলাকায় জমি কিনেছেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পচা চাল, ধানের তুষ, কৃত্রিম রং ও কেমিক্যাল মিশ্রিত ভেজাল মরিচের গুঁড়া মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। দীর্ঘদিন এসব পণ্য গ্রহণ করলে লিভার, কিডনি ও পাকস্থলীর জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ে। কেমিক্যাল রং ক্যান্সারের ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তারা।
আইন অনুযায়ী, নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ অনুসারে ভেজাল খাদ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করা গুরুতর অপরাধ। অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। এছাড়া ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ অনুযায়ীও জরিমানা ও কারাদণ্ডের সুযোগ আছে।
এ বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বরিশাল জেলার সহকারী পরিচালক সুমি রাণী মিত্র বলেন, অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুত অভিযান পরিচালনা করা হবে। প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় সচেতন মহল দ্রুত এই অবৈধ কারখানা বন্ধ করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, রমজান মাসকে সামনে রেখে এ ধরনের খাদ্য ভেজাল জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
হেড অফিস: ৩৯ দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা।
মোবাইল : ০১৭৪২-২৮০৪৯৮, মেইল: dailybarishalsangbad@gmail.com
© 2026 বরিশাল সংবাদ | Barisal Sangbad