


বরিশাল প্রতিনিধি: বরিশাল জেলার আড়িয়াল খাঁ নদে ভাসমান জীবন—শত বছরেরও বেশি সময় ধরে এটাই মানতা সম্প্রদায়ের নিয়তি। স্থায়ী ঠিকানা না থাকায় দীর্ঘদিন তারা ছিলেন জাতীয় পরিচয়পত্র ও নাগরিক সুবিধার বাইরে। তবে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে এবারই প্রথমবারের মতো এই সম্প্রদায়ের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। কিন্তু ভোটাধিকার পেলেও তাদের মনে নেই ভোটের উৎসব। অভিযোগ রয়েছে, ভোটের মাঠে তাদের কদর নেই; কোনো প্রার্থী বা তাদের প্রতিনিধিরা এই ভাসমান মানুষের কাছে ভোট চাইতেও যাননি।
ভেসে থাকা জীবনে প্রথম ভোটাধিকার
আড়িয়াল খাঁ নদে ভাসমান একটি নৌবহরে ৯৩টি নৌকায় বসবাস করছেন প্রায় ৪০০ মানুষ। এই সম্প্রদায়ের সরদার জসিম জানান, বহরের অন্তত ১০০ জন শিশু-কিশোর। বাকি ৩০০ প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে মাত্র ৭৩ জন এবার ভোটার তালিকায় স্থান পেয়েছেন। তারা সবাই প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, বরিশাল সদর উপজেলার চরবাড়িয়া নৌবহরেও একই চিত্র। সেখানে ২৮টি নৌকায় শতাধিক মানুষের বসবাস হলেও ভোটার অর্ধেকেরও কম। সরদার রানা জানান, তারাও ভোট দেওয়া নিয়ে সংশয় ও অনিশ্চয়তায় দিন পার করছেন।
‘ভোট দিয়ে কী হবে?’—ক্ষোভ ও হতাশা
দীর্ঘ বঞ্চনার ইতিহাস আর প্রার্থীদের উদাসীনতায় মানতা সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। সরদার জসিম আক্ষেপ করে বলেন, “আমাদের কাছে কেউ আসে না। ভোটকেন্দ্র কোথায়, প্রার্থী কে—এসবের কিছুই আমরা জানি না। গত এক সপ্তাহে মাত্র একজন প্রার্থী খোঁজ নিয়েছিলেন। তাই কেউ ভোট দিতে যাবে কি না, তা নিয়ে আমরা সন্দিহান।”
সম্প্রদায়ের এক প্রবীণ নারী জানান তাদের মানবেতর জীবনের কথা। তিনি বলেন, “আমরা নদীর পানি খাই, মরলে কবর দেওয়ার জায়গাও নেই। আমাদের কথা শোনার কেউ নেই। তাই ভোট দিয়ে কী হবে?”
ভোটার ও জনসংখ্যার পরিসংখ্যান
মানতা সম্প্রদায় নিয়ে কাজ করা চন্দ্রদ্বীপ ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির প্রধান সমন্বয়কারী মোহাম্মদ আলী জীবন জানান, বরিশাল সদর উপজেলার শায়েস্তাবাদ, চরকাউয়া, চরমোনাই ও টুংগীবাড়িয়াসহ পাঁচটি ইউনিয়নে তিন শতাধিক মানতা পরিবার বসবাস করে। এসব এলাকায় প্রায় ১,২০০ মানুষের মধ্যে মাত্র ৩৫০ জন ভোটার তালিকাভুক্ত। এ বছর নতুন করে আরও ২৮ জনের নাম তালিকায় যুক্ত হয়েছে।
তিনি আরও জানান, মেহেন্দিগঞ্জ, বাবুগঞ্জ উপজেলার মীরগঞ্জ এবং দপদপিয়া ফেরিঘাটসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় আরও চার শতাধিক মানতা পরিবার রয়েছে। জেলাজুড়ে এই সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা তিন হাজারের বেশি হলেও ভোটাধিকার রয়েছে প্রায় অর্ধেকের।
বরিশাল জেলা সমাজসেবা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রথমবারের মতো এই সম্প্রদায়ের ৫০ জন মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তা ভাতার আওতায় আনা হয়েছে। তবে তাদের মোট জনসংখ্যা ও ভোটার সংখ্যা নিয়ে সরকারিভাবে আলাদা কোনো পরিসংখ্যান নেই।
জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক আকতারুজ্জামান তালুকদার বলেন, “এই প্রথমবারের মতো তারা ভোট দিতে পারছেন, এটি ইতিবাচক। তবে তাদের সঠিক সংখ্যা এখনো সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি।”
অন্যদিকে, বরিশাল জেলা নির্বাচন কার্যালয় জানিয়েছে, জেলায় ছয়টি আসনে মোট ২২ লাখের বেশি ভোটার থাকলেও মানতা সম্প্রদায়ের ভোটারদের আলাদা কোনো শ্রেণি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। ফলে মূল স্রোতের ভোটারদের ভিড়ে এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আওয়াজ কতটুকু পৌঁছাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।