


ন্যাশনাল ডেস্ক: বরিশালে আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা। গত দুই বছরে রেজিস্ট্রেশনকৃত বিয়ের প্রায় অর্ধেকই বিচ্ছেদে গড়িয়েছে। বিচ্ছেদের আবেদনে পুরুষদের তুলনায় নারীরাই এগিয়ে রয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, স্বামীর বেকারত্ব, মাদকাসক্তি, সামাজিক অস্থিরতা ও ধর্মীয় অনুশাসনের অভাব এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী।
তুচ্ছ বিষয়, সন্দেহ ও মনোমালিন্য থেকেই অনেক ক্ষেত্রে ভেঙে যাচ্ছে দীর্ঘদিনের সংসার। সম্পর্কের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস হারিয়ে কেউ কেউ চরম হতাশায় ভুগছেন। এমনই এক ঘটনায় বরিশাল মহানগরীর নথুল্লাবাদ এলাকার ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম পারিবারিক সম্পর্কে ভরসা হারিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। তবে তিনি প্রাণে বেঁচে যান। রফিকুল ইসলাম বলেন, পরিবার ও দাম্পত্য জীবনে আস্থা হারিয়েই তিনি চরম সিদ্ধান্তের দিকে ঝুঁকেছিলেন।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয় থেকে হওয়া অনেক বিয়েও টিকছে না দীর্ঘদিন। বাড়ছে যৌতুক দাবি ও পরকীয়াজনিত কারণে সংসার ভাঙার ঘটনা। দুই বছর আগে ফেসবুকে পরিচয়ের মাধ্যমে ঢাকার এক যুবকের সঙ্গে বিয়ে হয় সালমার। পরিবারের অমতে হওয়া সেই বিয়ের শুরুতে সব ঠিক থাকলেও, একপর্যায়ে যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। এক বছরের মাথায় ভেঙে যায় তাদের দাম্পত্য সম্পর্ক।
বিচ্ছেদপ্রাপ্ত নারীরা জানান, বেকারত্ব, মাদকাসক্তি ও অনলাইন জুয়ার আসক্তির কারণে তারা নিয়মিত নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বাধ্য হয়ে তারা তালাক নিয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে যেতে বাধ্য হন।
বরিশাল জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় গড়ে প্রতিদিন প্রায় নয়টি বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে। গত দুই বছরে বরিশালে ১৮ হাজার ৬৪৪টি বিয়ের বিপরীতে বিচ্ছেদ হয়েছে ৬ হাজার ৩৫২টি। এর মধ্যে ২০২৩ সালে ৯ হাজার ৬৬৬টি রেজিস্ট্রি বিয়ের মধ্যে ভেঙেছে ৩ হাজার ৫টি সংসার। ২০২৪ সালে ৮ হাজার ৯৭৮টি রেজিস্ট্রি বিয়ের মধ্যে বিচ্ছেদ হয়েছে ৩ হাজার ৩৪৭টি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ধৈর্যহীনতা, পারিবারিক সহনশীলতার অভাব এবং ইন্টারনেট সহজলভ্য হওয়ায় বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের প্রবণতা বেড়েছে, যা সংকটকে আরও তীব্র করছে।
নারী নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল, বরিশাল আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আব্দুল মান্নান মৃধা বলেন, “বিচ্ছেদের যেন এক ধরনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। আদালতে এ সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। অধিকাংশ মামলার পেছনেই বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়ানোর অভিযোগ রয়েছে।”
ব্লাস্ট বরিশালের কো-অর্ডিনেটর অ্যাডভোকেট শাহিদা বেগম বলেন, ধর্মীয় অনুশাসন ও পারিবারিক মূল্যবোধ না মানার কারণে বিচ্ছেদের হার বাড়ছে। এটি কমাতে পরিবার ও সমাজভিত্তিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
বরিশাল জেলা রেজিস্ট্রার মোহসীন মিয়া বলেন, “২০২৩ ও ২০২৪ সালের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ডিভোর্স বা তালাকের ক্ষেত্রে নারীরা এগিয়ে রয়েছেন। ২০২৫ সালের পরিসংখ্যানে এই হার আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।”