


বরিশাল প্রতিনিধি: বরিশালসহ সন্নিহিত দক্ষিণাঞ্চলে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে এলপি গ্যাসের সংকট। সরবরাহ ঘাটতি ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ গৃহস্থের পাশাপাশি হোটেল–রেস্টুরেন্ট, কনফেকশনারি এবং গ্যাসচালিত যানবাহনগুলো কার্যত বন্ধ হওয়ার মুখে পড়েছে।
গ্যাস সংকটে বরিশালের বহু বাসাবাড়িতে নিয়মিত চুলা জ্বলছে না। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘুরেও গ্যাসচালিত স্কুটার ও তিন চাকার ইজিবাইকগুলো গ্যাস পাচ্ছে না। এতে নগর পরিবহন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
রোববার (২৫ জানুয়ারি) সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে বরিশাল মহানগরীর সিএন্ডবি রোডের একটি ফিলিং স্টেশনে মোংলা থেকে গ্যাসবাহী একটি ট্রাক পৌঁছানোর খবর ছড়িয়ে পড়তেই শত শত গ্যাসচালিত স্কুটার ও ইজিবাইক সেখানে ভিড় জমায়। এক পর্যায়ে ফিলিং স্টেশন সংলগ্ন জাতীয় মহাসড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।
দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেক যানবাহন গ্যাস সংগ্রহ করতে পারেনি। কোনো কোনো গাড়ি কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় গ্যাস নিতে সক্ষম হয়েছে।
গ্যাস সংকটে খাবার উৎপাদন সীমিত করায় হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও কনফেকশনারিগুলোতে পুঁজির ওপর চাপ বাড়ছে। ইতোমধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠানে জনবল ছাঁটাই শুরু হয়েছে, আর সামনে আরও কর্মহীনতার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
একইসঙ্গে বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলে শতাধিক এলপিজি ফিলিং স্টেশন দিনের পর দিন বন্ধ থাকায় সেখানেও কর্মী ছাঁটাই শুরু হয়েছে।
এলপিজি ডিলারদের দাবি, দেশে গ্যাস বিপণনকারী প্রায় ২০টি কোম্পানির মধ্যে অন্তত ৫টি কোম্পানি বরিশাল অঞ্চলে সম্পূর্ণভাবে সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। অবশিষ্ট কোম্পানিগুলোও সরবরাহ কমিয়ে এক-তৃতীয়াংশে নামিয়ে এনেছে।
অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত যমুনা ও মেঘনা পেট্রোলিয়াম কোম্পানি গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে এ অঞ্চলে এলপি গ্যাস বিপণন কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে। ফলে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে এ অঞ্চলের মানুষ।
সরকারি দাম ১,৩৩০ টাকা, বিক্রি হচ্ছে ১,৫০০ টাকার বেশি
সরকার নির্ধারিত সাড়ে ১২ কেজি এলপি গ্যাসের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ১,৩৩০ টাকা হলেও বেসরকারি কোম্পানিগুলো ডিলার পর্যায়েই প্রায় ১,৪০০ টাকায় বিক্রি করছে। ফলে খুচরা পর্যায়ে ভোক্তাদের গুনতে হচ্ছে ১,৫০০ টাকারও বেশি।
তবে সংকটের কারণে অধিকাংশ ডিলারের কাছেই গ্যাস মিলছে না।
সরকার নির্ধারিত দরের বেশি দামে বিক্রির অভিযোগে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত ডিলারদের জরিমানা করায় একপর্যায়ে ডিলাররা ধর্মঘটেও যান। এতে সরবরাহ পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে।
ডিলারদের অভিযোগ, প্রশাসন খুচরা বিক্রেতাদের জরিমানা করলেও বিপণন কোম্পানিগুলো কেন বেশি দামে গ্যাস সরবরাহ করছে—তা খতিয়ে দেখছে না ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।
ভোলায় দেশের অন্যতম বৃহৎ প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত থাকলেও গত ৩০ বছরের বেশি সময়েও এর সুফল পায়নি দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ। পূর্ববর্তী সরকার ভোলার গ্যাস সিলিন্ডারে করে ঢাকায় নিয়ে শিল্পখাতে ব্যবহার শুরু করলেও স্থানীয় অর্থনীতি ও জনজীবনে এর কোনো প্রতিফলন ঘটেনি।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারও একই নীতি বজায় রেখে সম্প্রতি জ্বালানি উপদেষ্টা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, “ভোলার গ্যাস ওই দ্বীপ জেলার বাইরে সরবরাহ করা হবে না।” অথচ বাস্তবে প্রতিদিনই ভোলা থেকে বিপুল সংখ্যক গ্যাসবাহী কাভার্ড ভ্যান ঢাকার দিকে যাচ্ছে।
দক্ষিণাঞ্চলের কোটি মানুষ নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও জ্বালানির জন্য বেসরকারি কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। প্রশাসনের নীরবতা ও কার্যকর নজরদারির অভাবে পরিস্থিতি দিন দিন আরও ভয়াবহ হচ্ছে।
কবে এলপি গ্যাসের এই সংকট কাটবে, কবে স্বস্তি ফিরবে—এ প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট উত্তর দিতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট কেউই।