
বরিশালে মনোনয়নপত্র বাছাই নিয়ে জটিলতায় পড়েছেন বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী ৭ নেতা। তাদের মধ্যে দুজনের মনোনয়নপত্র বাতিল করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। নানা ত্রুটির কারণে স্থগিত হয়েছে আরও ৫ জনের মনোনয়ন। যদিও রিটার্নিং কর্মকর্তার দেওয়া এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার কথা বলেছেন সবাই। তারপরও কোনো কারণে তারা নির্বাচনে ফিরতে না পারলে বদলে যাবে ৩টি আসনের ভোটের হিসাব। জয়-পরাজয়ের ধারায়ও আসতে পারে পরিবর্তন।
বরিশাল জেলার ৬টি নির্বাচনি এলাকায় প্রার্থী হতে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন ৬২ নেতা। তাদের মধ্যে ৪৮ জন জমা দেন। শুক্র ও শনিবার এসব মনোনয়নপত্র বাছাই করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা বরিশালের জেলা প্রশাসক খাইরুল আলম সুমন। বাছাইয়ে ৬ জনের মনোনয়ন বাতিল, ১০ জনের স্থগিত এবং ৩২ জনের প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করেন তিনি। বাতিল ও স্থগিত হওয়া প্রার্থীদের মধ্যে ১ জন বিএনপির, ২ জন জামায়াতে ইসলামীর, ২ জন জাতীয় পার্টির, ১ জন বাসদের এবং একজন বিএনপির বিদ্রোহী। বাতিল ও স্থগিতের এই সিদ্ধান্তে বরিশালের ২টি নির্বাচনি এলাকার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যেমন এসেছে পরিবর্তন, তেমনই অনেকটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন হয়ে পড়েছেন একটি আসনের বিএনপির প্রার্থী। রিটার্নিং কর্মকর্তার দেওয়া এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করাসহ প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হলেও আলোচ্য ৭ প্রার্থীর যে কোনো একজনও যদি ছিটকে পড়েন, তাহলে আমুল পালটে যাবে সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটযুদ্ধের সমীকরণ।
আয়কর রিটার্নে অসংগতির কারণে মনোনয়ন স্থগিত হয়েছে বরিশাল-১ (গৌরনদী-আগৈলঝাড়া) আসনের জামায়াত প্রার্থী হাফেজ কামরুল ইসলামের। এখানে যে ৩ শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী, তাদের একজন কামরুল। বিএনপির প্রার্থী সাবেক এমপি জহিরুদ্দিন স্বপন এবং দলের বিদ্রোহী জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সোবাহানের সঙ্গে ত্রিমুখী লড়াইয়ে ছিলেন তিনি। মনোনয়ন ফিরে না পেলে এখানে জামায়াত ছাড়াই বিএনপি আর বিদ্রোহীর মধ্যে হবে চূড়ান্ত লড়াই। বরিশাল-২ (উজিরপুর-বানারীপাড়া) আসনে মনোনয়ন স্থগিত হয়েছে দুই প্রভাবশালী নেতার। আয়কর ও দুর্নীতির মামলা সংক্রান্ত জটিলতায় মনোনয়ন স্থগিত হয়েছে বিএনপির প্রার্থী দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সরফুদ্দিন সান্টুর। এছাড়া অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর না থাকায় মনোনয়ন স্থগিত হয়েছে একই আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাস্টার আব্দুল মান্নানের।
প্রধান দুই দলের দুই প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হওয়ায় ভোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে টেনশনে বরিশাল-২ আসনের সাধারণ ভোটাররা। কেবল সান্টু আর মাস্টার আব্দুল মান্নান-ই নন, এখানে জাসদের প্রার্থী সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদের মনোনয়নপত্রও বাতিল করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দলীয় প্রধানের অঙ্গীকারনামা না থাকায় ওই সিদ্ধান্ত দেন তিনি। ফলে উল্লেখ করার মতো পরিচিত কোনো প্রার্থী আর রইল না এই আসনে। বিষয়টি সম্পর্কে আলাপকালে সরফুদ্দিন সান্টু বলেন, ‘এটি একেবারেই তুচ্ছ একটি বিষয়। তাছাড়া আমার মনোনয়ন তো বাতিল হয়নি, স্থগিত করা হয়েছে। রিটার্নিং কর্মকর্তার দপ্তর কিছু কাগজপত্র চেয়েছে। আমি তা দাখিল করলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।’
মনোনয়ন বাছাই প্রশ্নে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটেছে বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী) নির্বাচনি এলাকায়। এখানে বিএনপির আলোচিত বিদ্রোহী সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুস সাত্তার খানের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে শতকরা ১ ভাগ ভোটারের তালিকা ও স্বাক্ষরজনিত জটিলতায়। বাতিলের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করবেন বলে জানিয়েছেন তিনি। প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে সাত্তার খানের উপস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি জটিলতায় ছিলেন বিএনপি প্রার্থী দলের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন। রিটার্নিং কর্মকর্তার এই সিদ্ধান্তে অনেকটাই ভারমুক্ত এখন তিনি।
কেবল যে সাত্তার খানের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে তাই নয়, জাতীয় পার্টির আসন হিসাবে বিবেচিত বরিশাল-৩-এর জাপা প্রার্থী গোলাম কিবরিয়া টিপুর মনোনয়নপত্রও স্থগিত করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। দ্বৈত নাগরিকত্ববিষয়ক জটিলতায় ওই সিদ্ধান্ত দেন তিনি। জুলাই আন্দোলনের মামলায় বর্তমানে জেলে থাকা গোলাম কিবরিয়া টিপুর কন্যা ফারিয়া কিবরিয়া জানান, ‘মনোনয়নপত্র পূরণের ক্ষেত্রে দ্বৈত নাগরিকত্ব অংশে বিভ্রান্তিকর একটি প্রশ্নের কারণে এই জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। আমার বাবা দুইবারের সাবেক এমপি। তিনি দ্বৈত নাগরিক নন। বিষয়টি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়া হবে।’
এই আসনে জাতীয় পার্টির আরেক প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার ইকবাল হোসেন তাপসের মনোনয়নপত্রও বাতিল করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। অঙ্গীকারনামায় দলীয় প্রধানের স্বাক্ষর না থাকায় সেটি বাতিল করেন তিনি। ইঞ্জিনিয়ার তাপস বলেন, ‘সব প্রার্থীর পক্ষে দলীয় প্রধানের স্বাক্ষর সংবলিত অঙ্গীকারনামা নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হয়েছে। তারপরও কেন আমার মনোনয়ন বাতিল হলো বুঝতে পারছিনা। আমি এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করব।’ বিদ্রোহী সাত্তার খান এবং জাতীয় পার্টির দুই প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল ও স্থগিত হওয়ায় এই আসনে এখন বিএনপির জয়নাল আবেদীনের সামনে এবি পার্টির প্রার্থী ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ ছাড়া উল্লেখ করার মতো আর কোনো প্রার্থী রইলনা। নির্বাচনি জোট প্রশ্নে এখানে কোনো প্রার্থী দেয়নি জামায়াতে ইসলামী।
বাছাইয়ে বরিশাল-৫ (সদর) আসনে মনোনয়ন স্থগিত হয়েছে বাসদের জেলা সদস্য সচিব আলোচিত বাম নেত্রী ডা. মনিষা চক্রবর্তীর। হলফনামায় স্বাক্ষর না থাকা এবং অঙ্গীকারনামায় অসংগতির কারণে সেটি স্থগিত করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। যুগান্তরকে ডা. মনিষা বলেন, ‘২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশনের জারি করা পরিপত্রে ২-এর ১৬ অনুযায়ী এটি কোনো গুরুতর অপরাধ নয়। আমি ইতোঃমধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তা বরাবরে আবেদন করেছি। হলফনামায় স্বাক্ষর নিয়ে মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছি তাকে। আশা করি এই নিয়ে জটিলতা হবে না।’
উল্লিখিতদের পাশাপাশি বরিশালে আরও কয়েকজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল ও স্থগিত হলেও ভোটের মাঠের শক্ত পাল্লা হিসাবে তাদের তেমন কোনো অবস্থান না থাকায় সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি এলাকাগুলোয় কোনো প্রভাব পড়বে না বলে মনে করেন ওইসব এলাকার ভোটাররা। রিটার্নিং কর্মকর্তা বরিশালের জেলা প্রশাসক খাইরুল আলম সুমন বলেন, ‘মনোনয়ন স্থগিত থাকা প্রার্থীদের আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। যেসব কারণে তাদের মনোনয়ন স্থগিত রয়েছে, সেই কারণগুলোর সমাধান করতে পারলে অবশ্যই মনোনয়ন বৈধ বলে ঘোষিত হবে। রোববার বিকাল ৫টার মধ্যে আমরা মনোনয়নপত্র বৈধ হওয়া প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করব।’