
পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার ইচাদী নেছারিয়া দাখিল মাদরাসায় দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে মেয়েদের ভর্তি বন্ধ রেখে একটি পুরো এলাকার কিশোরীদের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ উঠেছে। ১৯৪৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর প্রাথমিকভাবে কিছু সময় মেয়েদের পড়াশোনার সুযোগ থাকলেও পরবর্তীতে বছরের পর বছর প্রতিষ্ঠানটিতে কোনো ছাত্রী ভর্তি নেওয়া হয়নি। ফলে নারীশিক্ষা কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ওই এলাকায় বাল্যবিয়ের ঝুঁকিও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
স্থানীয় সূত্র জানায়, মাদরাসাটির আশপাশে বিকল্প কোনো মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না থাকায় মেয়েদের তিন থেকে চার কিলোমিটার দূরের বিদ্যালয়ে যেতে হয়। বর্ষা মৌসুমে নোনাজল, কাদা ও জলাবদ্ধতার কারণে সেই পথ কার্যত অচল হয়ে পড়ে। এতে বাস্তবতার মুখে পড়ে অষ্টম শ্রেণির পরই অনেক ছাত্রী পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। এলাকাবাসীর অভিযোগ, এই সুযোগে একটি শ্রেণি ইচ্ছাকৃতভাবে নারীশিক্ষা ঠেকিয়ে রেখে সামাজিক অবক্ষয় ও বাল্যবিয়েকে প্রশ্রয় দিচ্ছে।
এই পরিস্থিতির প্রতিবাদ ও নারীশিক্ষার অধিকার নিশ্চিতের দাবিতে গত বুধবার (৭ জানুয়ারি) ইচাদী নেছারিয়া দাখিল মাদরাসা প্রাঙ্গণে মানববন্ধন করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
ভর্তিইচ্ছু শিক্ষার্থী মোসাম্মৎ তামান্না আক্তার বলেন, “আমাদের এখান থেকে অন্য মাদরাসায় যেতে অনেক কষ্ট হয়। বর্ষাকালে কাদা আর পানির কারণে চলাচলই করা যায় না। এখানে ভর্তি হতে পারলে আমাদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সহজ হতো।”
স্থানীয় নারী মিনারা বেগম বলেন, “দরজার পাশে মাদরাসা থাকা সত্ত্বেও আমাদের মেয়েরা এখানে পড়তে পারে না। দূরের মাদরাসায় গিয়ে পড়তে হয়। আমরা চাই, এখানেই মেয়েদের ভর্তি নেওয়া হোক।”
মাদরাসাটির গণিত বিভাগের সহকারী শিক্ষক মহাসিন উদ্দিন বলেন, “২০১২ সালে যোগদানের পর থেকেই দেখে আসছি মেয়েদের ভর্তি নেওয়া হয় না। ছারছীনা দরবার শরীফের অধীনে পরিচালিত হওয়ায় মেয়েদের ভর্তি নিষিদ্ধ—এমন একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। অথচ একজন শিক্ষক হিসেবে আমি মনে করি, মেয়েদের শিক্ষা গ্রহণের পূর্ণ অধিকার রয়েছে এবং উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে তাদের ভর্তি নেওয়া উচিত।”
সাবেক ইউপি সদস্য আলমগীর হোসেন মোল্লা বলেন, “এই মাদরাসায় আমিও পড়াশোনা করেছি। আমার সময়ে এখানে মেয়েরা পড়ত। বর্তমান সুপারের আপন ছোট বোনও আমার সঙ্গে লেখাপড়া করেছে। কীভাবে ধীরে ধীরে মেয়েদের পড়াশোনা বিলীন হয়ে গেল, তা আমার বোধগম্য নয়। যেভাবেই হোক এই মাদরাসায় মেয়েদের ভর্তি করাতে হবে।”
প্রতিষ্ঠানের একমাত্র নারী শিক্ষিকা রোকসানা বেগম বলেন, “আমি নতুন চাকরিতে যোগ দিয়েছি। এখানে আমার মতামতের কোনো মূল্য নেই। প্রতিষ্ঠানের প্রধান যা সিদ্ধান্ত নেন সেটাই আমাদের মানতে হয়। আমি চাইলেও কিছু করতে পারি না।”
তবে অভিযোগ অস্বীকার না করে পুরোনো প্রথার দোহাই দিয়েছেন মাদরাসার সুপার মো. সাইয়্যেদ আহমেদ। তিনি বলেন, “এই মাদরাসাটি ১৯৪৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং ছারছীনা দরবার শরীফের অধীনে পরিচালিত। দীর্ঘদিন ধরে এটি বালক মাদরাসা হিসেবেই পরিচালিত হয়ে আসছে। প্রতিষ্ঠানের ধরন অনুযায়ী এটি ছেলেদের মাদরাসা।”
তবে বালক মাদরাসা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত কি না—সে বিষয়ে কোনো লিখিত বা নীতিগত প্রমাণ দেখাতে পারেননি তিনি।
এ বিষয়ে গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, “বিষয়টি আমার জানা ছিল না। আমি খোঁজখবর নিয়ে দেখছি। প্রতিষ্ঠানটি পূর্বে কীভাবে পরিচালিত হতো তা জানার পর প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
পটুয়াখালী জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মুহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, “বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মেয়েদের শিক্ষা গ্রহণের সাংবিধানিক ও আইনগত অধিকার রয়েছে। তাই তাদের ভর্তি নিতে হবে। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার মাধ্যমে এবং আমি নিজেও এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিচ্ছি। আশা করি, কর্তৃপক্ষ তাদের অবস্থান থেকে সরে এসে মেয়েদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করবে।”